চণ্ডী লাহিড়ী
পঞ্চাশের দশকে চপলাকান্ত ভট্টাচার্য আনন্দবাজার পত্রিকা-র সম্পাদক। তিনি এক সাংস্কৃতিক সফরে আমন্ত্রিত হয়ে জার্মান গেছেন। সঙ্গে কয়েকজন বাঙালি সাংবাদিকও আছেন।
চপলাবাবু বৈদিক ব্রাহ্মণ অত্যন্ত গোঁড়া এবং এই প্রগতির যুগেও জাতপাত মানেন। সবাই হোটেলে খেলেও চপলাবাবু নিজ ঘরে স্বপাকরন্ধনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই গোঁড়ামিটা সহযাত্রী বন্ধুরা পছন্দ করেননি।
দ্বিতীয় দিনে দরজা বন্ধ করে, চপলাবাবু উনুনে ভাত চাপিয়েছেন। বাইরে বন্ধুরা রসিকতা করলেন। তাঁদের দেখাশোনার জন্য যে সুন্দরী তরুণী ছিলেন, তার হাতে খানিকটা দুধ দিয়ে বললেন, ভিতরে মি: ভট্টাচায্যিকে দিয়ে এসো।

পঞ্চমুখী গাঁজার কলিকা
মেমসাহেব দুধ নিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে আসতেই, চপলাবাবু হাঁ হাঁ করে উঠলেন। ম্লেচ্ছ মাগির হাতে দুধ! তাঁর সেদিন আর খাওয়া হল না।
বাগবাজারের গাঁজার আড্ডা, গুলির কোন্নগরে, বটতলায় মদের আড্ডা, চণ্ডুর বৌবাজারে—এইসব মহাতীর্থ যে না চোখে হেরে, তার মতো মহাপাপী নাই ত্রিসংসারে।
বাগবাজারের গাঁজার আড্ডা এখন এক কিংবদন্তী। এই আড্ডার জন্মদাতা শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৭৮৩-১৮১৯) দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র। শিবচন্দ্র ধনী পরিবারের আদরের দুলাল। তিনি নিজে যে খুব গাঁজার ভক্ত ছিলেন তা নয়। কিন্তু বাপের টাকা ওড়াবার দুর্বার আকর্ষণে গাঁজাখোরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তিনি ‘গোকর্ম বিহার’ নামক যে গাঁজা-কেন্দ্র স্থাপন করেন সেই ঘরটি একালে কেউ করলে, গিনেস রেকর্ডে স্থান পেত। ৩০০ হাত লম্বা ও ১০০ হাত চওড়া একটি ঘরের মেঝে তৈরি হয়েছিল তামাক দিয়ে, গাঁজা দিয়ে ঘরের বেড়া এবং সিদ্ধি দিয়ে ঘরের চাল নির্মিত হয়েছিল।
তখন সমাজেও বকাটে ছেলেদের মধ্যেও আভিজাত্যবোধ প্রবল ছিল। যাঁরা হিন্দু কলেজের ছাত্র তাঁরা নিজেদের মদের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতেন। গাঁজা টানা তাঁদের পক্ষে অবমাননা। যাঁরা একটু দ্বিতীয় শ্রেণির, আভিজাত্যবোধ তেমন প্রবল নয়, তাঁরা যেতেন গাঁজার আড্ডায়। যাঁরা আরও গরিব, বংশ ও অর্থের কোনো কৌলীন্য যাঁদের নেই তাঁরা ছিলেন গুলির ভক্ত।
সমসাময়িক একটু বর্ণনা— ‘একখানি ভাঙ্গা ঘরের মধ্যে ২০-২৫ জন লোক বসিয়া আছে। তাহাদের অষ্ট অঙ্গের শিরাগুলি দেখা যাইতেছে। প্রত্যেকটি চক্ষু যেন ঠিকরাইয়া পড়িবার উদ্যোগ হইয়াছে। সকলেরই সম্মুখে এক একটি কলসির কানার উপর একটি ডাবা হুঁকা। নলচের মাথার দিক অর্ধেক আন্দাজ কাটা তদুপরি একটি ভাঙ্গ কলকের বাঁট। হুঁকায় এক একটি এক হাত দেড় হাত আন্দাজ নল লাগান। প্রত্যেকে ধূমপান করিতেছে ও এক একবার শোলা চুষিতেছে।
ইংরেজ সরকার তাঁকে রাজা উপাধি দেননি। তবু সমসাময়িক কালে সর্বত্রই তাঁকে রাজা শিবচন্দ্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গাঁজা-ঘর নির্মাণ ছাড়াও শিবচন্দ্র বিখ্যাত ‘পক্ষীর দলের’ উদ্ভাবক ও প্রতিষ্ঠাতা।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন