চণ্ডী লাহিড়ী
যাঁরা সত্তরোর্ধ প্রবীণ, গ্রামোফোন রেকর্ডের কথা উঠলেই তাঁরা সর্বাগ্রে স্মরণ করবেন সংগীত-সম্রাজ্ঞী গওহরজানকে। গওহরজান তাঁর জীবদ্দশাতেই লিজেণ্ড। তাঁর মা-ও ছিলেন নামি শিল্পী। ভারতজোড়া নাম। মালকাজান।
কাশীর কাছে আজমগড়ের বরফ ব্যবসায়ী উইলিয়ম রবার্ট ইওওয়ার্ড ছিলেন গওহরজানের বাবা। মায়ের নাম ভিক্টোরিয়া হেমিং। বাবা আর্মেনিয়ান, মা ইহুদি। এঁদের কন্যা অ্যানজেলিনার জন্ম হয় ১৮৭৩ সালে। ভিক্টোরিয়া হেমিং ভারতেই জন্মেছিলেন এবং ভারতীয় নৃত্য-গীত আয়ত্ত করে সেটাকেই জীবিকা করে নেন। ইহুদি অ্যাঞ্জেলিনা পরে খুরশিদ নামে এক যুবকের প্রেমে পড়েন এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেন। ফলে ভিক্টোরিয়ার নাম হয় মালকাজান কন্যার নাম গওহরজান। গওহরজান মালকাজানকে বলা হত বড়ি মালকাজান কারণ সেসময় আরও দুজন মালকাজান গানবাজনায় খ্যাতিমান হন। গওহরজান জীবদ্দশাতেই লিজেণ্ড। এদেশে গ্রামোফোন রেকর্ডকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন এই সংগীত প্রতিভা। যাঁরা ক্লাসিকাল গান বোঝেন না তাঁরাও আভিজাত্য প্রমাণের জন্য গ্রামোফোনের সঙ্গে গওহরজানের দু-একটি রেকর্ড কিনে রাখতেন। গওহরজান, একে সুন্দরী তদুপরি ধনী ও অত্যধিক তেজী মহিলা হওয়ায়, তাকে নিয়ে যে সম্ভব অসম্ভব নানা গল্প বাজারে চালু হয়ে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। সেসময়কার গভর্নরকে নিয়ে যে সব গল্প বাজারে চালু ছিল তার অনেকগুলিতেই ভেজাল।
তাঁর নির্দেশ অমান্য করে গভর্নরের অশ্বযান আগে চলে যায় এবং তিনি হাইকোর্টে এ নিয়ে মামলা করে জেতেন। এটি অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছে। তবে তাঁর গান শোনার জন্য গভর্নর যে টাকা অফার করেন সেটা গওহরজান প্রত্যাখ্যান করেন—এটি সত্য হলেও হতে পারে।
কলকাতার পথে যে চার ঘোড়ার গাড়িতে তিনি চলাফেরা করতেন, তার সব ঘোড়াই ছিল ধবধবে সাদা। তাঁর পোষা বিড়াল-বিড়ালির বিয়েতে খরচ করেছিলেন ১২০০ টাকা এবং তাদের পুত্রকন্যা জন্মালে খরচ করেছিলেন ২০০০ টাকা।
গওহরজানের সময় গায়িকা হিসাবে প্রচুর খ্যাতি ছিল বোম্বেওয়ালি বেনজিরের। এক মহফিলে গওহরের আগেই তাঁর গাইবার কথা। বেনজির এলেন সর্বাঙ্গে মণিমাণিক্যসহ স্বর্ণালঙ্কারে নিজেকে ভূষিত করে। গাইলেন এবং আসর মাত করে দিলেন। গহওর সাধারণত প্রচুর গহনা পরেই তান ধরতেন। তাঁকে টেক্কা দেবার জন্যই সম্ভবত বেনজির সেদিন প্রচুরতর হিরে জহরতে সেজেছিলেন।
এবার গওহর আসরে নামলেন। গায়ে অতি সামান্যই গহনা ও খুব সাধারণ পোশাক। গান গেয়ে অনায়াসে বেনজিরকে টেক্কা দিলেন। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ।
গওহর যাবার সময় বেনজিরের সঙ্গে দেখা করে বলে গেলেন, গহনা গান করে না। গান করে মানুষের কন্ঠ।
বেনজির বোম্বে ফিরে গেলেন। গায়ের সমস্ত গহনা গুরুর পদতলে রেখে আরও বেশি করে তালিম নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তাঁর এবারের সাধনা বৃথা গেল না। গুরুও প্রচুর দিলেন তাঁকে।
দশ বছর পর সেই বেনজির এলেন কলকাতায় এবং কেবল গওহরজানকে নিজের গান শোনালেন। জওহর খুব খুশি। বললেন, হীরের দ্যুতি এখন তোমার গলায় বাসা বেঁধেছে। অন্য হীরের কোনো দরকার নেই।
একবার উত্তরপ্রদেশের এক ধনী নবাবের কাছ থেকে অনুরোধ আসে তাঁর রাজ্যে গিয়ে মাইফেল করতে হবে। গওহরজান রাজী হলেন একটি শর্তে—যে ট্রেনে তিনি যাবেন, তাতে কেবল গওহরজান এবং তাঁর লোকজন যাবে। বাজনদার, রন্ধনের লোকজন ওয়াড্রোবের দেখাশোনার জন্য স্পেশাল লোক। আতর বিতরণের জন্য এমনকি ফুলের তোড়া ও মালা বানাবার লোক—সবাই যাবে। নবাব কথা রেখেছিলেন, গওহরজানও গিয়ে নবাবের মর্যাদা রেখেছিলেন। বহুকাল আমরা শুনে এসেছি, একটি সমগ্র ট্রেন ভাড়া করে গওহরজানের এই ভ্রমণ কাহিনি।
গওহরজানের একরাত্রের মুজরার মজুরি ছিল সেকালের ভারতে সর্বোচ্চ—তিন হাজার টাকা। একালে এই দু হাজার সালে প্রায় তিন লাখ টাকা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন