চণ্ডী লাহিড়ী
তাজমহল যে সম্রাট সাজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগমের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য বিপুল ব্যয়ে নির্মাণ করেছিলেন—এ তথ্য সবাই জানেন। প্রচুর গান, কবিতা, নাটকও লেখা হয়েছে সাজাহান ও মমতাজকে কেন্দ্র করে। আর যেখানেই সাজাহান, সেখানেই তাজমহল নিয়ে আলোচনা। কিন্তু তাজমহলের প্রথম মডেলটি যাঁর নির্মাণ তাঁর কথা তেমন গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাসে লেখা হয়নি। অথচ এই মডেলটি হাতে না পেলে সম্রাট হয়তো কোনোদিন তাজমহল নির্মাণ করতেন না।
সম্রাটের ইচ্ছাপ্রকাশের আগেই, মমতাজের মৃত্যুর খবর পেয়ে এক শিল্পী শোকাহত হয়েছিলেন। তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাজমহলের দুটি মডেল নির্মাণ করেন। একটি মাটির সর্বসাধারণকে দেখানোর জন্য, অন্যটি পাথরের— কাউকে দেখাবার জন্য নয়।

শিল্পীর নাম ইসা মহম্মদ—একজন গুণী শিল্পী হিসাবে সম্রাট তাঁকে চিনতেন। তাঁর প্রিয় বেগমের সঙ্গেও ইসা মহম্মদের পরিচয় ঘটেছিল। সম্রাটের মতো সম্রাজ্ঞীও ইসাকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। আর সেকারণে মমতাজের মৃতুতে ইসা মহম্মদ খুব আঘাত পান।
লোকমুখে রটে গিয়েছিল ইসা মহম্মদ নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাজমহলের মডেল বানিয়েছেন। কথাটা সম্রাটের কানেও পৌঁছেছিল। সম্রাট প্রতিনিধি পাঠালেন, অনুরোধ জানিয়ে। কিন্তু রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ। সম্রাটের প্রতিনিধি হয়ে এলেন সেনাপতি। ইসা প্রথমে অস্বীকার করলেন কিছু দেখাতে। পরে মাটির মডেলটি দেখালেন।
সেনাপতি বললেন—পাথরের একটি মডেল তুমি বানিয়েছ সেখবর আমি জানি। সেটা না পেলে তোমায় বেঁধে নিয়ে যাব।
ইসা মহম্মদ খাঁটি শিল্পী। ভয় পেলেন না। সেনাপতি যখন ইসাকে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ করলেন। ঠিক সেই সময় সম্রাট হঠাৎ হাজির। সম্রাটকে ইসা বলে বসলেন, একমাত্র সম্রাট সাজাহান ছাড়া আমার শিল্পধর্ম কেউ বুঝবে না। সম্রাটের হাতেই আমি পাথরের নমুনা দেব। তাই দিলেন এবং দেখামাত্র সম্রাট মুগ্ধ।
ইসা সম্রাটকে বোঝালেন—জাফ্রির মধ্য দিয়ে যখন হাওয়া যাবে—মমতাজের কান্না আপনি শুনতে পাবেন।
ইসা মহম্মদ কেবল তাজমহলের মডেল করেই বসে থাকেননি। সম্রাটের অনুরোধে, কোন শিল্পী কোন কাজ করবে তারও নির্দেশ দিলেন। তাঁরই আমন্ত্রণে তুরস্ক থেকে এলেন সত্তার খান। তিনি পাথরের গায়ে হরফ লিখবেন— মহম্মদ আরিফ এলেন সুদূর সমরখন্দ থেকে। তাঁর মতো ফুল, পাখি, লতাপাতার কাজ জানা লোক দ্বিতীয়টি নেই। আমানত খান এলেন পারস্যের সিরাজ থেকে। তাঁর কাজ বিশেষ ধরনের। হাওয়া যখন জাফ্রির মধ্য দিয়ে যাবে তখন করুণ মধুর শব্দের ইন্দ্রজাল দর্শকদের আনন্দ দেবে। আকবরাবাদ থেকে আনা হল হানিফকে—এত বড়ো একটা কাজের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য।
ইসা মহম্মদের পরম বন্ধু ছিলেন নাসিম খান। নাসিম প্রতিপদে ইসাকে পরামর্শ দিতেন। নাসিমের অপছন্দ হলে কোন পাথরের টুকরোই ব্যবহৃত হবে না। নাসিমও সম্রাটের খুব স্নেহভাজন ছিলেন।
কোনো মহৎ শিল্প কর্মই নিছক টাকার জোরে করা যায় না। সম্রাট জানতেন, কাজের প্রতি ভালবাসা চাই, চাই স্বপ্ন দেখা এবং দেখানোর ক্ষমতা।
সাজাহান স্থপতি নির্বাচনে ভুল করেননি। কিন্তু ইতিহাস স্থপতিদের জন্য কোনো পরিচ্ছেদ রচনা করেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন