চণ্ডী লাহিড়ী
পাশ্চাত্য-সঙ্গীতজগতের নক্ষত্র মোসার্ট ১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর মারা যান। তাঁকে সমাধি দেওয়া হয় এমন এক স্থানে যে-স্থানটি ভাগ্যহত গরীবদের জন্য বরাদ্দ। তখন থেকেই বহু মানুষের ধারণা মোসার্ট খুব গরিব ছিলেন। অথচ জীবনে তিনি প্রচুর রোজগার করেছেন। বসবাস ও বন্ধুত্ব ছিল সেকালের অভিজাতদের সঙ্গে। এতটাকা রোজগার করলেন কোথায় গেল সেই টাকা?

সব বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেটা হয়, মোসার্টের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কেন্দ্র করে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বহু গল্প চালু হয়ে যায়। আর সেই গল্প বানানোর প্রতিযোগিতায় যোগ দেন তাঁর স্ত্রী কনদট্যানসা। প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সুরু হয়ে গেলেড্ডকে কত গল্প বানাতে পারে। মোসার্ট খ্যাতিমান ছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে রচিত হয়ে থাকল ‘মিথ’।
মোসার্টের স্ত্রী কনসট্যানসা অবশ্য কোনদিনই তেমন স্বামী অনুগত ছিলেন না। স্বামীকে কেন্দ্র করে তাঁর খ্যাতি ও অর্থ ভোগ করার প্রবল লিপ্সা ছাড়া পতিভক্তির কোনো প্রমাণ নেই। প্রথমে স্বামীর সম্পর্কে প্রচুর গল্প, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বানিয়ে তিনি কিছু অর্থ উপার্জন করে নেন। তারপর বিয়ে করলেন গেয়র্গ নিকোলাস নিশান (Nissan) নামক এক ড্যানিস ডিপ্লোম্যাটকে। নিশান নিজে যে বড়ো লেখক ছিলেন তা নয়। কিন্তু তিনি জানতেন, মোসার্টের সদ্য-বিধবা স্ত্রী কনস্ট্যানসাকে বিয়ে করতে পারলে, কনস্ট্যানসার বলা মোসার্ট সম্পর্কিত ঘটনাবলি বাজারে কাটবে। মোসার্টের বিধবা স্ত্রী বলা গল্পই।
অচিরে মোসার্টের বিধবা স্ত্রীর বানানো সত্যমিথ্যা দিয়ে ৬০০ পাতার মোসার্ট-জীবনী প্রকাশিত হল।
এর কিছুদিন পর মোসার্টের শেষ পাঁচ বছরের সঙ্গী, এনটন স্নাইডার (Anton Scindler) প্রকাশ করলেন মোসার্টের আর এক জীবনী। মোসার্টের সঙ্গে ভদ্রলোক ছিলেন মোটে পাঁচ বছর। বইতে লিখলেন দশবছর। এই বই আরও বিভ্রান্তি ছড়ালো। কোনটি সত্যি, কোনটি মিথ্যা বোঝা দুঃসাধ্য।
মেসার্টের একটি বিখ্যাত সুরের নাম রিকোয়েম (Requiem) এটি রচনার অনুরোধ এসেছিল কাউন্ট ওয়ালসেগ (Count Walsegg) নামক এক ধনী সংগীতপ্রেমিকের কাছ থেকে। তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রীকে অমর করে রাখার জন্য মোসার্টকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন। মোসার্টের স্ত্রী সেই সত্য ঘটনাটি চেপে গিয়ে লিখলেন, নিজের মৃত্যু আসন্ন বুঝে মোসার্ট নিজ শোক গাথা আগাম রচনা করেছেন রিকোয়েম সঙ্গীতলহরীতে।
মোসার্টের স্ত্রী কনসট্যানসা সহ্য করতে পারতেন না তাঁর স্বামীর সহকারী শব্দযন্ত্রী স্যালিয়েরীকে। রিকোয়েম রচনার সময় মোসার্টের সহকর্মী ছিলেন স্যালিয়েরি। কনস্ট্যানসা কোনদিনই মোসার্টের স্ত্রী হওয়া ছাড়া সৃষ্টির জগতে কোন সাহায্য করেননি। রিকোয়েম পরে আমেডিউস নামে নাটকে পরিণতি পায়।
যাই হোক, কনসট্যানসা প্রচার করে বেড়ালেন, স্যালিয়েরি, মোসার্টের জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারতেন না। তিনি বিষপ্রয়োগ করে গোপনে মোসার্টকে হত্যা করেন। এ ঘটনার সত্যমিথ্যা জানার কোন উপায় নেই। সালিয়েরি অতি সামান্য মানুষ, মোসার্টকে হত্যা করার কোন সঙ্গত কারণ আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকের সন্দেহ মোসার্টের সঞ্চিত টাকাকড়ি বাগিয়ে কনস্ট্যানসা নিজেকে নিরাপদ করার জন্য স্যালিয়েরির ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়েছিলেন। স্যালিয়েরি দুঃখে ভেঙ্গে পড়েন। নিজের মৃত্যু আসন্ন মনে করে তিনি পিয়ানো-বাদক বন্ধু মোসেলকে (Moscheles) বলে যান— না। গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দিও মোসার্টকে আমি মারিনি।
“I assue you in good faith that there is no truth in the rumour, you know what I mean—that I poisoned Mozart. But no, Mr. Moscheles, tell the world, it is malice, pure malice, old Salieri who will soon be dead, has told you this.”
তবু স্যালিয়েরির কথায় স্বার্থান্বেষী কেউ কেউ বিশ্বাস করেননি। বিষ প্রয়োগ করে মহান সংগীতসাধককে মারা হয়েছিল এরকম একটা প্রচারের মধ্যে রহস্য-রোমাঞ্চের মশলা আছে। এর মধ্যে ড্রামা আছে। আর ড্রামা থাকলে ভাল ব্যবসা আসবে। অতএব, পুশকিন নাটক লিখলেন। পিটার স্যাফার (Peter Shaffer) সেই নাটক সেটজে ‘আমাদিউস’ (Amadeus) নামে অভিনয় করিয়ে বিখ্যাত হলেন। পয়সা দিল প্রচুর। এসব ছেড়ে স্যালিয়েরির বক্তব্যে কান দিলে নাটক জমবে না। অতএব, সাধারণ মানুষ অতি অখ্যাত শিল্পী কুখ্যাত হয়ে রইলেন ইতিহাসে। স্যালিয়েরি বলে কেউ যে ছিলেন, সেটা আজও অনেকে জানেন না। কেবল সিনেমা থিয়েটারে আমাদিউস দেখে অনেকে মোসার্টের জন্য চোখের জল ফেলেছে। সবাই বিশ্বাস করেছে বিষ প্রয়োগে খুন করা হয়েছিল মোসার্টকে।
মোসার্টের কবর দেওয়ার কথা সুরুতে বলেছি। সেকালে তিন ধরনের কবরের ব্যবস্থা প্রাশিয়াতে ছিল। অত্যন্ত ধনীদের কবর স্থান ছিল রিজার্ভড। পয়সা থাকলেই হবে না। আভিজাত্যও থাকতে হবে। মোসার্ট পয়সা অর্জন করেছেন কিন্তু রক্তের দিক থেকে তিনি অভিজাত ছিলেন না।
দ্বিতীয় শ্রেণীর কবর স্থানে (১৭৯১ নাগাদ সময়ে) দশ-বারো জন মানুষের জন্য ছোট স্থানে একটা ব্যবস্থা ছিল। একদলকে কবর দেবার পর, ৩০। ৪০ বছর পর সেখানকার মাটি তুলে নতুন কালের মানুষদের সমাহিত করা হত। কোথাও শ্বেতপাথরের কোনো ফলক থাকত না। একই স্থানে বছরের পর বছর। মাটি তুলে নতুন মাটি ফেলে নতুন কালের মানুষকে কবর দেওয়ার এই যে ব্যবস্থা এটাই মোসার্টের কপালে জোটে। সেকালে এটাই ছিল নিয়ম। যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। কোথাও সামান্য উপেক্ষাও করা হয়নি। পরবর্তীকালে কেউ কেউ এটাকে (Man-grave) গণকবর বলে ভুল করেছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন