চণ্ডী লাহিড়ী
এক সময় বাঙালি তীর্থযাত্রীরা পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়ি চড়ে পুরীর উদ্দেশ্যে যেতেন। সেসময় উড়িষ্যা ছিল বাংলার সঙ্গে যুক্ত। পুরীর বিস্তীর্ণ অংশে বাঙালিদের জমিদারি। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারেও ওড়িষ্যার সঙ্গ বাঙালিদের মধুর সম্পর্ক।
একবার এক বাঙালি জমিদার সস্ত্রীক পালকি চেপে পুরী যাচ্ছেন। যাবার পথে অথর নালার কাছে লক্ষ্য করলেন বহু তীর্থযাত্রী নালা পারের জন্য যে ট্যাক্স দিতে হয় সেটা দিতে পারছে না। অথচ নালায় প্রচুর জল। সাঁতরে যাওয়া যায় না। জমিদারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন—‘সেতু পারাপারের মাশুল কত?’ পালকিবাহী যাত্রীর চেহারা চৌকিদারের তেমন পছন্দ হয়নি। সেঅনেক টাকা। তুমি নিজেরটা দিয়ে চলে যাও।
পালকির বাবু বললেন, ‘না, যত যাত্রী এখানে আটকে আছে তাদের আসা-যাবার দুবারের ভাড়া কত আমায় জানাও।’
বড়ো হিসেবের কথা। ডাক পড়ল শ্বেতাঙ্গ সাহেবের।
পালকির বাবু বললেন, আমার নাম নীলমণি মল্লিক। নিবাস কলকাতায়। ডাকাতির ভয়ে সঙ্গে বেশি টাকা রাখি না। কালেক্টর সাহেবকে বলুন—আমার ভাই বৈষ্ণব দাস মল্লিকের কাছে আমার চিঠি দেখালে যত টাকা লাগবে—সব পেয়ে যাবেন। দরকার হলে নদীর ওপরকার সেতুটাই আমি কিনে নিতে পারি।
ইংরেজ কালেক্টারের চক্ষু স্থির। তিনি বৈষ্ণবদাস মল্লিকের নাম খুবই জানেন। কলকাতার খোদ গভর্নরের সঙ্গে এই মল্লিকদের ওঠাবসা। কালেক্টর তখনই হুকুম দিলেন নীলমণি মল্লিকের সম্মানে সেতু পারাপারের টোল আদায় আজ থেকে পাকাপাকি বন্ধ হয়ে গেল।
নীলমণি মল্লিক মার্বেল প্যালেসের মল্লিক বংশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ওড়িষ্যায় বহু নদীর টোল আদায়ের ব্যবস্থা তিনি তুলে দিয়েছিলেন।
সরকার নয়। কোনো সভা-সম্মেলনও নয়। দেশের আপামর সাধারণ মানুষ আড়ালে নীলমণি মল্লিককে দানবীর বলে সম্মানিত করত। কোনো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা নীলমণির কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়নি। নীলমণি কেবল নগদ টাকা দিয়ে বসে থাকতেন না। যখনই পারতেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়েবাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের দায় নিজের হাতে তুলে নিতেন।
নীলমণি অপুত্রক ছিলেন। শেষ জীবনে রাজেন মল্লিককে দত্তক নেন। নীলমণি অতিথি আপ্যায়নের জন্য অতিথি-ভবন তৈরি করিয়েছিলেন। বাড়িতে জগন্নাথদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অতিথি সৎকারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল, কেউ যেন অভুক্ত অবস্থায় ফিরে না যায়। সবাই ঠিক বারোটায় জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাবে। সবাই পেটপুরে খাবে। খাওয়ানোটা যেন দায়সারা ব্যাপার না হয় সেটা নিজে দেখতেন। তাঁর অবর্তমানে স্ত্রী হীরামণি এবং পুত্র রাজেন্দ্রলালও অতিথি সৎকারের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখতেন।
বাইরের দেউড়িতে পেটা ঘড়ি ছিল। ছাদে উঠে এই ঘড়ি বাজানো হত। উত্তর কলকাতার যত হাভাতে গরিব মানুষ সবাই লাইনে বসে পড়তেন আহারের জন্য। আর এই পেটা ঘড়ির আওয়াজ শুনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঠিক আগে পর্যন্ত কলকাতার লোকেরা ঘড়ি মিলিয়ে নিতেন।
মল্লিক বাড়ির এই বিনি পয়সার ভোজ প্রথম জীবনে খেয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়েছেন দুজন সাহিত্যিক—বিশু মুখোপাধ্যায় ও শিবরাম চক্রবর্তী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন