চণ্ডী লাহিড়ী
বাংলা সিনেমায় এককালে বিখ্যাত কৌতুকশিল্পী ছিলেন অজিত চ্যাটার্জী। ঠনঠনের কালীবাড়ির কাছাকাছি কোথাও থাকতেন। একবার স্বাধীন ভিয়েতনাম থেকে একদল সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি কলকাতায় এসেছিল সরকারি সফরে। স্বয়ং জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁদের সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করলেন। মুখ্যমন্ত্রী ভাষণ দিলেন ইংরেজিতেই। ভিয়েতনাম দলের মুখ্য প্রতিনিধি তাঁদের মাতৃভাষায় যে ভাষণ দিলেন দর্শকদের কেউ তার মাথামুন্ডু বুঝলো না। সেই দুর্বোধ্য বিদেশি ভাষায় ভাষণ শোনার পর কলকাতায় নাগরিকদের কিছু বলার পালা। এটাই সৌজন্য। অথচ কেউ কথা বলতে ওঠে না। কৌতুকাভিনয় কখনো ভাষার ওপর নির্ভরশীল নয়। কিছু মজার ব্যাপার অভিনয় করলে গম্ভীর হাওয়াটা হালকা হবে। অবশেষে মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে অজিত চট্টোপাধ্যায় কিছু বলতে উঠলেন। গড় গড় করে ভিয়েতনামী নেতা যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আউরে গেলেন। ভিয়েতনামী ভাষা অজিতবাবুও জানতেন না। কিন্তু অনুকরণ করার অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর। সেই ভাষণ শুনে বিদেশি ভিয়েতনামী নেতার বদ্ধ ধারণা হল অজিতবাবু নিশ্চয়ই ভিয়েতনামী। অন্তত কিছুদিন নিশ্চয়ই সেই দ্বীপভূমিতে কাটিয়েছেন। দুটি ধারণার কোনোটিই সত্য নয়।
ঠনঠনিয়ার এই অজিত চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বাংলা সিনেমায় জহর রায় ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব। বয়সে অবশ্য বড়ো তুলসী চক্রবর্তী। তুলসী চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল খুবই দুঃখের। বাবা রেলে চাকরি করতেন বটে কিন্তু তিনবছর বয়সেই তুলসী পিতৃহীন হন। জ্যাঠার ছিল গানের দল। স্টার থিয়েটারে বাজাতেন তিনি। ভাইপো তুলসীকে জ্যাঠা একদিন স্টারের ডিরেক্টর অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেন। সেই শুরু তুলসী বাবুর অভিনয় জীবন।

অভিনয় জীবনেও তুলসী চক্রবর্তী দারিদ্র্যের সঙ্গে একটানা লড়াই করেছেন। তুলসীবাবু নিজেই স্বীকার করেছেন, পরশপাথরের সত্যজিৎ রায় সবচেয়ে বেশি দক্ষিণা দিয়েছেন তাঁকে। শুধু টাকা নয়—হাওড়া-কলকাতা ডেলি প্যাসেঞ্জার নিত্যবাসযাত্রী তুলসীবাবু ট্যাক্সি করে যাওয়া-আসা করেছেন। সব খরচ দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। এটা তাঁর জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাসযাত্রার ধকল সইতে দেননি তুলসীবাবুকে।
নিজের সৌভাগ্যকে তুলসীবাবু ঠিক বিশ্বাস করতে পারেননি। সত্যজিতের কাছ থেকে একলপ্তে অনেক টাকা পাওয়ায় তাঁর ধারণা হয়েছিল, সত্যজিতের অ্যাকাউনমট্যান্টন্টেট হয়তো ভুলে বেশি দিয়ে ফেলেছেন। পরে যদি ফেরত চায় সেজন্য সহজে টাকা খরচ করেননি।
তুলসী চক্রবর্তী স্কুলে মাত্র ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছিলেন কারণ খুব শৈশবে তাঁর বাবা মারা যান। ভানু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। জহর রায় প্রবাসী বাঙালি। পড়াশোনার মাধ্যম হিন্দি। কলকাতায় থাকতেন কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় মির্জাপুর স্ট্রিটের এক মেসে। তাঁর সঙ্গী প্রচুর বাংলা বই। লাইব্রেরি তৈরি করে তার মধ্যেই বাস করতেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন