চণ্ডী লাহিড়ী
রামমোহনের আবক্ষ মূর্তির ছবি প্রচুর দেখা যায়। কিন্তু চোগা-চাপকান পরিহিত চেহারা বড়ো একটা দেখা যায় না। প্রচলিত ধারণা এই, রামমোহনের যবনী রক্ষিতা ছিল এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্ষণশীল হিন্দুরা এই যুগস্রষ্টা মনীষীকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। চোগা-চাপকান মুসলমান পোশাক। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র সবাই চোগা-চাপকান পড়েছেন কিন্তু তাঁদের মুসলমান রক্ষিতার সাহচর্য নিয়ে কোনো বদনাম নেই। ভীত, সন্ত্রস্ত ব্রাহ্মরা রামমোহনের চরিত্ররক্ষার জন্য চোগা-চাপকানের ব্যাপারটা তুলে দেন। ক্ষুদ্রবুদ্ধি ব্রাহ্মরা ভেবে দেখেননি, রামমোহনের মতো যুগস্রষ্টা সমাজ সংস্কারককে পোশাক দিয়ে বা যবনী সংস্রব দিয়ে হেয় করা যায় না। তিনি অনেক বড়ো মাপের মানুষ। রামমোহনের ছিল বীর হৃদয়। যেটা করতেন এবং যা বিশ্বাস করতেন সেটা প্রকাশ্যেই করতেন। অকারণ লোকলজ্জাকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। চোগা-চাপকান তিনি পরতেন এবং প্রকাশ্যেই তার প্রশংসাও করতেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্যরাও সমাজে প্রার্থনার সময় চোগা-চাপকানের বদলে ধুতি, চাদর ও পিরান পরতেন। চোগা-চাপকান পরিহার করে চলতেন।

চোগা-চাপকান পরিহিত রামমোহনের সবচেয়ে সুন্দর ছবি আছে রামমোহন লাইব্রেরিতে।
রামমোহনের মুসলমান রক্ষিতার কথাটাও এই প্রেক্ষিতেই বিচার করা উচিত। যা তিনি করতেন, প্রকাশ্যে করতেন। সেকালে সমাজে মান্যগণ্য বলে বিবেচিত হবার দুটি মাপকাটি ছিল—প্রথমটি, বাগানবাড়িতে বাবুর মুসলমানি নর্তকী ক-টি আছে এবং দ্বিতীয়টি দেওয়ানি আদালতে বাবুর ক-টি মামলা ঝুলছে।
সেকালে বেশির ভাগ ধনী মানুষ মুসলমানি রক্ষিতা পুষতেন। এটি দোষের ব্যাপার বলে সমকালীন সমাজে নিন্দিত হত না। যেহেতু রামমোহন হিন্দুধর্ম মানতেন না, লক্ষ লক্ষ দেবদেবী বিশ্বাস করতেন না—সেজন্য রক্ষণশীল হিন্দুরা মুসলমান রক্ষিতার ব্যাপারটি রং চড়িয়ে দেখাতেন।
এই ন্যুব্জদেহ বামন দেশে রামমোহন একমাত্র মানুষ যিনি সদা উন্নত শির। সর্বদা মাথা উঁচু করে চওড়া বুক সামনে রেখে চলতে জানতেন। নির্ভয় একটি পুরুষ যাঁর মেরুদন্ড ছিল, রামমোহন রক্ষিতা রেখেছেন প্রকাশ্যে। কোনো গোপনীয়তা নেই, তখনকার দিনে লক্ষ্ণৌ থেকে সদ্য আসা নিকি বাইজি হাজার টাকা নিতেন। রামমোহন তাকে রেখেছেন টানা একমাস। প্রকাশ্যেই। যবনী গর্ভজাত নিজপুত্র শেখ মকসুদকে রাজারাম রায় নাম দিয়ে বিষয়সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিয়ে যান। যবনী গর্ভজাত কি ব্রাহ্মণী গর্ভজাত তা নিয়ে সজনীকান্ত-ব্রজেন্দ্রনাথরা অনেক তর্কবিতর্ক করেছেন। কিন্তু লোকে মনে রেখেছে—সতীদাহ রূপকারী বীর রামমোহনকে। তাঁর যবনীদোষ নিয়ে উত্তরকালে কেউ মাথাব্যথা করেনি। খোদ বেদব্যাস নিজ জন্মবৃত্তান্ত মহাভারত লেখার সুরুতেই কবুল করেছেন। ব্রাহ্মণ পরাশর মুনি ও ধীবরকন্যার সত্যবতীর মিলনে তাঁর জন্ম। মহাভারতের কথা ইতিহাস মনে রেখেছে—বেদব্যাসের জন্মরহস্য নিয়ে কারও কোনো কৌতূহল নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন