চণ্ডী লাহিড়ী
ইংরেজ ও ব্রিটিশ—তফাৎটা কী? ইংল্যাণ্ড ও ব্রিটেন তো একই দেশ। তাহলে কখনো ব্রিটেন এবং কখনো ইংল্যাণ্ড বলা হয় কেন? উত্তরটা একালের ব্রিটেন বা ইংল্যাণ্ডবাসী নরনারীরাও জানে না।
এ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা বা লেখালেখি সেদেশে অনুচিত বলে বিবেচিত হয়। জাতীয় সংহতির কথা বিবেচনা করে সবাই বিষয়টি এড়িয়ে যান।
স্কটল্যাণ্ড ও ইংল্যাণ্ড পাশাপাশি দুটি দেশে, দুটি সিংহাসনে দু-দেশের দুই রাজা বসেন। তাঁদের ধর্ম খ্রিস্টধর্ম হলেও ধর্মীয় আচরণ পৃথক। ১৭০৭ সালে দুটি দেশ ঐক্যচুক্তি (Treaty of Union) অনুসারে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৬০৩ সাল পর্যন্ত স্কটল্যাণ্ড ও ইংল্যাণ্ডে দুজন রাজা রাজত্ব করতেন। ১৭০৭ পর্যন্ত দুদেশের দুটি পার্লামেন্ট ছিল। দুটি দেশের শিক্ষা ও সামাজিক রীতি আজও সমান্তরাল ভাবে চালু আছে।
স্কটল্যাণ্ডের লোকেরা আজও মনে করেন পাশের দেশ ইংল্যাণ্ড খুব ধনী। তারা স্কচদের সহ্য করতে পারে না, স্কচদের ঘৃণা করে। সত্যিই তাই। ব্রিটিশ হিউমার প্রায়ই স্কচদের আক্রমণ করে বানানো হয়। তারা নাকি ভয়ানক কৃপণ। ইংরেজরা বিশ্বের নানাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছে। সর্বত্র ইংরেজরা দেশ শাসন করেছে—স্কচরা তাদের পেছন পেছন এসে কলকারখানা বসিয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যে তারা এগিয়েছে কিন্তু কোনো রাজকীয় ব্যাপার, মহৎ কোনো জীবনদর্শন তাদের নেই। কলকাতার কাছে গঙ্গার দুপারে যত জুটমিল, প্রায় সবই স্কচদের।
স্কচ বলতে বোঝায় স্কচ হুইস্কি। ট্রেনে বা ট্রামে তারা কেবল কাগজ পড়ে—পাশের লোকের সঙ্গে আলাপ করে না। কারণ জানো? আলোচনা করার মতো সংস্কৃতি তাদের নেই। কবি বলতে মোটে একজন—রবার্ট বার্নস। সেও জুটমিলের শ্রমিক। ব্রিটেনের আছে শেকসপিয়র, কিটস, শেলি, বায়রন ইত্যাদি কয়েকশো নাম।

শ্রমিকরা (Labour Party) যখন সরকার গঠন করেছিল তখন স্কচ মন্ত্রীদের সংখ্যা ছিল বেশি। আর সেই শ্রমিক সরকার ইন্ডিয়ান, ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকান ইত্যাদি বহু বিদেশিকে ইংলণ্ডের নাগরিক করে দেওয়ায় বিশুদ্ধ ব্রিটিশ সংস্কৃতি লোপ পেতে বসেছে।
একদা ইংলিশ, স্কটিশ, ওয়েলস ইত্যাদি নানা জাতি (Nation) ধর্ম ও সংস্কৃতি, পাশাপাশি স্বাধীনভাবে বসবাস করেছে। স্কটিশরা সর্বদাই ব্রিটেনের লোকদের ইংলিশ বা ইংল্যাণ্ড বলে উল্লেখ করে। আর ব্রিটেনের লোকেরা নিজেদের ব্রিটিশ বলে—এটা বোঝাতে যে তাদের কালচার বহু পুরাতন ও ধনী। লণ্ডনের পথে-ঘাটে রাস্তা মেরামতির ঘাম-ঝরানো কাজে যে সব শ্রমিক কাজ করে, শ্বেতাঙ্গ হলে নিশ্চিতভাবে তারা স্কচ।
২০০৭ সালে স্কটল্যাণ্ড ও ইংল্যাণ্ডের এই মিলন নিয়ে ইংল্যাণ্ডের লোকজনের তেমন মাথাব্যথা নেই, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনশো বছর পূর্তি সরকারিভাবে পালন করা হবে। কিন্তু স্কচদের কাছে এই তিনশো বছর পূর্তি উৎসব খুব গুরুত্বপূর্ণ। পলাশি-যুদ্ধ আমাদের কাছে যেমন দুঃখের স্মারক, সেরকমই স্কচরাও ভুলতে পারে না ১৭০৭ সালে তারা পরাধীন হয়েছিল। তাদের লোকসংগীত ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে সেই পার্থক্যটা স্কচরা ধরে রেখেছে। সেজন্য লণ্ডনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঐক্যের স্বপক্ষে যে প্রচারের ঢাক পেটানো হবে, স্কচদের রাজধানী এডিনবরায় বহু ছোটো ছোটো গোষ্ঠী এটাকে স্বাধীনতা বিসর্জন দিবস হিসেবে পালন করবেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন