চণ্ডী লাহিড়ী
মূর্খদের মধ্যে দলাদলি দেখতে আমরা যতটা অভ্যস্ত পন্ডিতদের মধ্যে দলাদলি দেখতে তত অভ্যস্ত নই। মাঝে মাঝে পন্ডিতদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বড়ো প্রকটভাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণ গ্রন্থে এরকম দলাদলির একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন—
‘ভূরিভোজের ব্যবস্থাটা বরাবরই আমাদের দলের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। সাধারণত রাখালবাবুই ঐতিহাসিক পুরাতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ইহার ব্যবস্থা করিতেন। একবার আমাদের বাড়িতে নৈশভোজের ব্যবস্থা হইল। আমি ভান্ডারকরকে নিমন্ত্রণ করিলাম। যথাসময়ে সকলেই উপস্থিত হইলেন। কিন্তু রাখালবাবু আসিয়া সেই শুনিলেন যে, ভান্ডারকরকেও নিমন্ত্রণ করা হইয়াছে, অমনি বলিলেন ভান্ডারকর আসিলে তিনি কিছুতেই আমার বাড়িতে অন্নগ্রহণ করিবেন না। বন্ধুরা সকলেই বুঝাইলেন—কিন্তু রাখালবাবু নিজের গোঁ ছাড়িলেন না। আমার তখনকার অবস্থা সকলেই বুঝিতে পারিবেন। আমি অগত্যা হেমচন্দ্র দাশগুপ্তের শরণাপন্ন হইলাম। আমাদের দলে তিনিই রাখালবাবুর সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন এবং একমাত্র তাঁহাকেই রাখালবাবু কিছু সমীহ করে চলিতেন। ইহা আমি জানিতাম। সুতরাং তাহাকে বলিলাম, আমাকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার করুন। আমি তখন ভবানীপুরে থাকিতাম। যেকোনো মুহূর্তে ভান্ডারকর আসিতে পারেন। তাহা হইলে একটা কেলেঙ্কারি ব্যাপার হইবে। হেমবাবু রাখালবাবুকে লইয়া বাহির হইয়া হরিশ মুখার্জি রোডে গেলেন। সেখানে অনেক রকম বুঝলেন এবং সর্বশেষে বোঝালেন যে, রাখালবাবু যদি এইভাবে আমাকে অপদস্থ করেন তবে তিনি কখনো তাঁহার বাড়িতে জলগ্রহণ করিবেন না। যাহা হউক, কোনোরকমে তিনি রাখালবাবুকে রাজি করাইয়া সঙ্গে নিয়া আসিলেন। ইতিমধ্যে ভান্ডারকর আসিয়া রাখালবাবুর কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। আমরা বলিলাম, তিনি এখনও আসেন নাই। একটু পরেই হেমবাবু ও রাখালবাবু ফিরিলেন। আশ্চর্যের বিষয় রাখালবাবু এমন স্বাভাবিকভাবে ভান্ডারকরের সঙ্গে কথাবার্তা বলিলেন যেন উভয়ের মধ্যে কোনো গোলমালই নাই। তারপর আনন্দের সঙ্গে আহারপর্ব শেষ হইল। যতীন রায় ২৯টি হাঁসের ডিম খাইলেন তখনও বাড়িতে মুরগির ডিম চালু হয় নাই। হেমবাবু দেড় সের দই খাইলেন। এইরকম এক-একজন এক-একটি আহার্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ইহা আমাদের সকলেরই জানা ছিল। রাখালবাবুর বাড়ির খাওয়াতেই তাহার প্রথম পরিচয় পাইয়াছিলেন। কে কোন জিনিস কত বেশি খায়, রাখালবাবুর তাহা মুখস্থ ছিল। তদনুযায়ী ব্যবস্থা থাকিত।’

রাখালবাবু কেবল যে বাড়িতেই খাওয়াইতেন তাহা নহে, রেলপথে ভ্রমণের সময়ও এদিকে তাঁহার দৃষ্টি থাকিত। একবার পাটনায় কোনো সম্মেলন উপলক্ষ্যে আমরা কয়েকজন একসঙ্গে কলিকাতা হইতে রওনা হইলাম। রাত্রে খাওয়ার পর যাত্রা করিয়া পরদিন প্রাতঃকালে পৌঁছিয়া জয়সোয়ালের বাড়িতে উঠিব এরূপ ব্যবস্থা ছিল। সুতরাং সঙ্গে খাবার লইবার কোনো ঝঞ্ঝাটের ছিল না। হাওড়ার একটি দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় রাখালবাবু, আমি, যতীন রায়, রামকমলবাবু ও আরেক জন এবং পার্শ্বের কামরায় আরও দু-তিনজন ছিলেন। রাখালবাবুর সঙ্গে দেখিলাম দুটি বড়ো ঢাকা ডেকচি। জিজ্ঞাসা করিলাম—ইহার মধ্যে কী? তিনি বলিলেন—ও জয়সোয়ালের জন্য কিছু মিঠাই। রাত্রে উপরের বাঙ্কে ঘুমাইয়া আছি। অকস্মাৎ রাখালবাবুর চিৎকারে ঘুম ভাঙিয়া গেল। আমার উদ্দেশ্য কয়েকটি অশ্লীল সম্বোধন করিয়া যাহা বলিলেন তাহার মর্মার্থ, ডেকচিতে আড়াই সের মাংসের কোপ্তা ছিল। যতীন রায় টের পাইয়া তাহা খাইতে আরম্ভ করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন