চণ্ডী লাহিড়ী
পন্ডিত রবিশংকর তাঁর কন্যা অনুষ্কাকে সেতারে দীক্ষা দিয়েছিলেন খুব শৈশবেই। বিখ্যাত বাপের মেয়ে অনুষ্কা সেতার যতই ভালো বাজান, সাধারণ মানুষ তার বাদনে অসাধারণত্ব কিছু খুঁজে পাবে না। অথচ রবিশংকর নিজে আদিতে ছিলেন নৃত্যশিল্পী—সেতার-বাদনে এসেছিলেন অনেক পরে। কঠোর পরিশ্রমে তিনি সেতার বাদন আয়ত্ত করেছিলেন। রবিশংকর শিশুপ্রতিভা ছিলেন না।

শিশু প্রতিভা ঠিক কাকে বলে? তৈরি হয় কীভাবে? বহুকাল ধরেই বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে শিশু প্রতিভার উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে। কারও ধারণা বিষয়টি বংশগত, কারও মতে বাবা-মা খুব শৈশব থেকে চাপ দিয়ে অত্যধিক পরিশ্রম করিয়ে ছেলে-মেয়েকে প্রতিভাবান-রূপে গড়ে তোলেন। কারও মতে, নিরন্তর পরিশ্রমই সাফল্যের মূল কারণ।
একটি ব্যাপারে সবাই একমত—শিশু প্রতিভা আবিষ্কার ও তার বিকাশে বাবা-মায়ের একটি বড়ো ভূমিকা থাকে। বেহালা বাদনে ভুবনবিখ্যাত ইয়েহুদি মেনুহিন ছিলেন খুবই গরিব ঘরের সন্তান। বাবা-মায়ের Baby-Sitter রাখার ক্ষমতা ছিল না। বাচ্চাকে দেখাশোনা কে করবে? বাধ্য হয়ে শিশুকে সঙ্গে নিয়েই থিয়েটারে যেতেন কনসার্ট শুনতে। যখন বালকের বয়স মাত্র চার, তখন একটা খেলনা বেহালা বাবা-মা শিশুকে কিনে দেন। কিন্তু সেবেহালা তো বাজাবার জন্য নয়। কোনো সুর বের হয় না তার থেকে। অতএব বাবা নিয়ে এলেন সত্যিকার ভালো বেহালা। সেই বেহালার হাত ধরে অচিরে উঠে এলেন ভবিষ্যতের বিখ্যাত শিল্পী ইয়েহুদি মেনুহিন।
আর এক বেহালাবাদক জানোস স্টার্কার (Janos Starker) বলেছিলেন—তাঁর মা স্যাণ্ডুইচ টুকরো টুকরো করে কেটে বাজনার টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন। খিদে পেলে বেহালা রেখে উঠে আসতে হবে না। হাতের কাছেই খাবার মজুদ। নিরন্তর অনুশীলন। কোনো ফাঁক থাকবে না।
দেখা গেছে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম মহাযুদ্ধ পর্যন্ত সেরা বেহালাবাদকরা উঠে এসেছেন রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি থেকে। প্রশ্নটি প্রায়ই ওঠে, ভূগোলের কী সত্যিই কোনো ভূমিকা আছে? ইসাক স্টার্ন Isak Stern (বিশ্ববিখ্যাত বেহালার জাদুকর) এ সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন—কোনো রহস্য নেই। রাশিয়া জার্মানি বা পূর্ব ইউরোপের নানা দেশ থেকে যে ঝাঁকে ঝাঁকে বেহালাবাদকদের খ্যাতির শিখরে উঠে আসতে দেখা যায় একটু লক্ষ রখলেই বোঝা যাবে, সবাই তারা ইহুদি। পৃথিবীর ওই অংশে তখন ইহুদিদের ওপর খুবই নিপীড়ন চলছিল। রাশিয়ায় সেসময় সন্ধ্যা ছটা বাজলেই ইহুদিদের পথে বের হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। একমাত্র ছাত্র যারা তারা অবশ্য স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করত। বাবা-মায়েরা ছোটোদের গলায় ঝুলিয়ে দিতেন একটি বেহালা—যাতে বোঝা যেত এরা স্কুলে যাচ্ছে বাজনা শিখতে। রুশ ভাষায় এইসব ছাত্রকে বলা হয় SVOBODA বা মুক্ত ছাত্র—যার গতিবিধিতে বাধা নেই রাশিয়ার জারিনা এদের রক্ষা করতে আইন করেছিলেন। বেহালা বাদনে দক্ষতা থাকাটা আভিজাত্য বলেও গণ্য হত সেসময়। কাজেই বাবা-মায়েরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ছেলে-মেয়েদের বেহালাবাদই শেখাতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগেই বেহালার জয়যাত্রা শুরু হয় জাপানে। এই পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্রটি তারা শিখে নেয় এবং সেখানে এতই জনপ্রিয় হয় যে আমেরিকা, জার্মানি বা রাশিয়ার বেহালাবাদকেরা এখন খ্যাতি অর্জনের জন্য জাপানে যায়। অথচ বেহালা বাদনে জাপানের কোনো পুরাতন ঐতিহ্য নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন