চণ্ডী লাহিড়ী
একসময় কলকাতায় তিন রামের প্রবল প্রতিপত্তি ছিল। রামশঙ্কর হালদার ছিলেন ব্যায়ামবিদ। আটটি গরুর গাড়ি একহাতে রুখে দিতেন। রামশঙ্কর ঘোষ ঠনঠনে কালিবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। বিদ্যাসাগর কলেজের জমি ইনি দান করেছেন।
রামতনু দত্তর নাম অবশ্য কিংবদন্তী।
টাকা ওড়ানোর বিলাসিতায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সম্ভবত রামতনু দত্ত। তনু দত্ত বলেই তাঁকে চেনে। বাবা মদন দত্ত পুত্রের জন্য বিপুল বিষয়-আশয় রেখে যান। তনুবাবু প্রতিদিন নতুন ধুতি কিনতেন। চাকর সেই নতুন ধুতির পাড় ছিঁড়ে বাবুকে পরিয়ে দিত। পাড় থাকলে কোমরে গিঁট দেবার সময় নরম চামড়ায় লাগবে। বিশাল মার্বেল পাথরের বারান্দা প্রতিদিন ভোরে গোলাপ জল দিয়ে ধোয়া হত।
বন্ধুদের নিয়ে বৈঠকখানায় দামি সিগারেট ধরাতেন দশ টাকার নোট পুড়িয়ে।
এই বাবু রামতনু দত্তকে নিয়ে বহুলপ্রচলিত একটি কাহিনি (আদৌ গপ্পো নয়) আজও শোনা যায়।
একটি বিশাল আয়না কিনেছিলেন। ডেনমার্ক থেকে জাহাজে আনা অতি বৃহৎ আয়না। লক্ষ টাকা দাম। বিলাসিতার ব্যাপারে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী তনু দত্ত (যাকে তিনি পিতৃবন্ধু হিসেবে কাকাবাবু বলে সম্বোধন করতেন) মশাইয়ের বাড়িতে সেই সদ্য কেনা আয়নাটি পাঠালেন। কেমন হয়েছে সেটা তনু দত্তর মতো অভিজ্ঞ মানুষ বলুন।
তনু দত্ত চালাক মানুষ। বুঝলেন লাখ টাকার বিদেশি আয়না কিনে তাঁকে টেক্কা দিতে চায়। সেই আয়না বাড়ির সামনের লনে পেতে রাখলেন। তাঁর প্রিয় ঘোড়াকে সেই আয়নার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে খান খান করে ভাঙলেন সেটি। তারপর একটি চিঠি পাঠালেন—‘নবু, তোকে ছেলেমানুষ পেয়ে ঠকিয়েছে। একলাখে ভালো আয়না হয়না। আমি দুলাখ টাকা দিয়ে আরও ভালো আয়না আনতে দিলাম। এলেই সেটা পাঠাবো তোর কাছে।’
ধনদৌলত নিয়ে বাইরে বন্ধুত্বের একটা আবরণ রেখে ঠাণ্ডা লড়াই-এর উদাহরণ আরও আছে। চূড়ামণি দত্তের কাছে এক সরলমতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ একটি ছোটো শিশি নিয়ে এলেন একটু মধু নিতে।
চূড়ামণি দত্ত বললেন, ভালো টাটকা মধু আমার কাছে নেই।
নবকৃষ্ণের কাছে গেলেই পাবে। তবে হ্যাঁ, ছোটো শিশি নিয়ে যেওনা। কলসি নিয়ে যাও। অনেক আছে তার।
সরলমতি ব্রাহ্মণ একটি কলসি নিয়ে নবকৃষ্ণের দ্বারস্থ হলেন। নবকৃষ্ণ শোনামাত্র ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তিনি প্রত্যাঘাত করতে জানেন। এক কলসি আতর ব্রাহ্মণকে দিয়ে বললেন, চূড়ামণি দত্তকে একবার কলসির গন্ধটা শুকিয়ে নিয়ে তবেই ব্যবহার করবে। খাঁটি মধুর গন্ধ একবার শুঁকেই চূড়ামণি বুঝতে পারবে।
কলকাতার কথা থাক। কাটোয়ার ওপারে মেটিরী বলে এক গ্রামে আমার (চন্ডী লাহিড়ী) শৈশবের কয়েকটি বছর কেটেছিল। সেই গ্রামে অনেক জমিদারের বাস। কার্তিক সেন ছিলেন খুব জেদি জমিদার। আমার পিতৃবন্ধু এবং দানধ্যানে উদারহস্ত।
তিনি নিকটবর্তী বড় শহর কাটোয়ার সবচেয়ে বড়ো বিপণি বারীশ দত্তের দোকানে গেলেন। খুবই বড়ো দোকান, কলকাতা থেকে নিত্য মাল আসতো সেখানে। সরাসরি দোকানের মালিককে বললেন—আতর দেখান।
নানা রঙের শিশিতে নানা দামের আতর দেখানো হল। জমিদার কার্তিক সেনের পছন্দ হলনা। এক কর্মচারী বললেন, এর চেয়েও দামি আতর আছে। কিন্তু তার যা দাম আপনি কিনতে পারবেন না।
কার্তিক বাবু বললেন—তবু একবার দেখাও। কিনতে না পারি নয়নদুটি সার্থক করি।
দোকান-কর্মচারী সেই অতি মূল্যবান আতর বের করলেন।
সেটি নিয়ে নিজের আর্দালিকে কার্তিকবাবু বললেন, যে ঘোড়ার গাড়িতে এসেছেন সেই ঘোড়াদুটির গায়ে মাখিয়ে দিতে। তাই করা হল। দাম মিটিয়ে দিয়ে কার্তিকবাবু বললেন—কাটোয়ার ঘোড়ার গাড়িতে চড়া যায় না, বড়োই দুর্গন্ধ।
এই কার্তিক সেনের নাম আমাদের শৈশবে কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে। তাঁর আর একটি কাহিনি আমার শৈশবে নিজের দেখা। মেটিরি গ্রামের রেলস্টেশন ছিল দাঁইহাট। ট্রেন পাঁচ মিনিট থামে। কার্তিকবাবু নিজের গরুর গাড়িতে ধীরগতিতে আসছেন। স্টেশনে ট্রেন পৌঁছে গেছে। কার্তিকবাবু সঙ্গের চাকরকে প্রচুর টাকা দিয়ে পাঠালেন। চাকর ছুটে এসে ট্রেনের চেন টানল। চেন টানার ফাইন পাঁচ টাকা সেটা নিয়ে গার্ড আবার ট্রেন ছাড়ল। আবার চেন টানা হল। গার্ডের হাতে নগদ পাঁচ টাকা দেওয়া হল। এভাবে মোট ষাট টাকা ফাইন দেবার পর কার্তিকবাবু পৌঁছোলেন। ততক্ষণে সাহেব গার্ড বুঝে গেছেন, জমিদারটি যথেষ্ট ধনী। যে দৃশ্যটি দেখা গেল এরপর সেটা ইংরেজদের পক্ষেই সম্ভব। গার্ড ফার্স্টক্লাসের দরজায় নিজে দাঁড়িয়ে কার্তিকবাবুর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন