চণ্ডী লাহিড়ী
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে স্যার আশুতোষের উৎসাহ ছিল প্রচুর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যকে এম.এ. স্তরে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহসও দেখিয়েছিলেন তিনি। তথাপি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো বিবুধ প্রতিষ্ঠান তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত। স্যার আশুতোষ বা তাঁর সুযোগ্য পুত্র ড. শ্যামাপ্রসাদ কোনোদিনই সাহিত্য পরিষদ ভবনে পদার্পণ করেন নি। বিষয়টি অপ্রিয় হওয়ায় সমকালীন পন্ডিত ব্যক্তিরা আলোচনাটি মুখে মুখে করলেও প্রকাশ্যে পাশ কাটিয়ে গেছেন।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছিলেন স্যার আশুতোষের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। ছুটির দিনে প্রায়ই একত্রে আহার করতেন, বাংলা সংস্কৃত সাহিত্যের নানা শাখা নিয়ে আলোচনা করে তৃপ্তি পেতেন। সম্পর্ক ব্যক্তি ছাড়িয়ে দুটি পরিবারকে একত্রিত করেছিল। হরপ্রসাদকে সম্মান জানিয়ে স্যার আশুতোষ নিজ পুত্রদের নামের শেষে প্রসাদ যোগ করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ, রমাপ্রসাদ ইত্যাদি হরপ্রসাদও নিজ পুত্রের নাম দিয়েছিলেন ‘তোষ’ ব্যবহার করে। বড়ো ছেলেও বিখ্যাত পন্ডিত বিনয়তোষ ভট্টাচার্য।
বন্ধুত্বের উত্তাল স্রোত প্রথম বাধা পেল। স্যার আশুতোষ যখন বিধবা কন্যা কমলার বিয়ের জন্য উদ্যোগী হলেন। বিধবার পুনর্বিবাহ। ভাটপাড়ার পন্ডিত হরপ্রসাদ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না। আশুতোষ নিজে ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি—তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে যেসব যুক্তি দিলেন হরপ্রসাদ খন্ডন করলেন সেসব যুক্তি। বন্ধুত্বের দেওয়ালে যে চিড় ধরল, তর্কবিতর্কে সেটা বড়ো ফাটলে পরিণত হল। স্যার আশুতোষ কন্যার বিবাহ পাকা করলেন। নিজে গেলেন হরপ্রসাদের নৈহাটির বাড়ি। হরপ্রসাদ আপ্যায়নের ত্রুটি করলেন না। কথা দিলেন কন্যাসমা কমলাকে আশীর্বাদ করবেন। কিন্তু হরপ্রসাদ আসেন নি। তিনি শাস্ত্রকে আঁকড়ে থাকলেন।
দুই বন্ধুর পথ অতঃপর ভিন্ন হল। আর দুজনে দেখা হয়নি। এতে লোকসান হল সাহিত্য পরিষদের। স্যার আশুতোষের মতো ব্যক্তির (বলা ভালো প্রতিষ্ঠান) সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে সাহিত্য পরিষদের চেহারা হত অন্যরকম। কলকাতার বহু ধনী ও চিন্তাবিদ মানুষ পরিষদ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। স্যার আশুতোষের দুর্লভ ও অতি মূল্যবান গ্রন্থরাজি পুত্রেরা দান করেছেন ন্যাশনাল লাইব্রেরিকে। সাহিত্য পরিষদকে নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন