চণ্ডী লাহিড়ী
সেই দূর অতীতে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘অসম্ভব বলে কোনো কথা আমার অভিধানে নেই।’ বহু বছর পর অন্য এক প্রেক্ষিতে এক তরুণ অভিযাত্রী বলে ফেললেন ‘আমার মতে কিছুই অসম্ভব নয়।’ অভিযাত্রীটির রক্তে রয়েছে প্রাচীন ভাইকিং অভিযাত্রীদের ধারা। তরুণের নাম থর হেয়ারডাল। নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভূগোল নিয়ে পড়তেন। তাঁর স্ত্রী লিভ টর্প (Liv Torp) পড়তেন অর্থনীতি।

মানচিত্র এবং বইপত্র ঘেঁটে হেয়ারডালের দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে প্রাচীন বিশ্বের মানুষ পলিনেশিয়ার দ্বীপে বসতি স্থাপন করেছিল। তখন বড়ো বড়ো কাঠের জাহাজ ছিল না। লোহা অন্য দেশে হয়তো আবিষ্কৃত হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার আদিম অধিবাসীরা লোহার ব্যবহার জানত না। লোহা নেই, কাঠকাটার কুড়াল, করাত কিছু নেই। অতএব তারা জাহাজ বানাতেই জানত না। অথচ তারা গিয়েছিল। কীভাবে? হেয়ারডাল স্থির করলেন, সেকালের সেই আদিম মানুষদের অনুকরণ করে তিনি পলিনেশিয়ার পথে যাত্রা করবেন। জাহাজ নয়। সরকাঠি ও গাছের ছাল দিয়ে ভেলা বানিয়ে অজানা সমুদ্রে রওনা দেবেন পলিনেশিয়ার পথে। তিনি নিউইয়র্কের একপ্লোরার্স ক্লাবের কাছে গেলেন কিছু সাহায্যের আশায়। কাগজপত্র, ম্যাপ দেখিয়ে বোঝালেন সবকিছু। কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিলেন তাঁরা। সবটাই তাঁদের হেয়ারডালের পাগলামি বলে মনে হয়েছিল।
হেয়ারডাল কিন্তু থামলেন না। নিজের উদ্যোগেই সরকাঠি (Reeds) দিয়ে ছোটো ভেলা তৈরি করলেন। দড়ি হিসেবে ব্যবহার করলেন গাছের ছাল। কোথাও লোহার তার বা পেরেকের ব্যবহার হল না। পাঁচজন সঙ্গী, কিছু খাদ্য আর খবরাখবর পাঠাবার জন্য রেডিয়ো সেট। এই ভেলা অভিযান ইতিহাসে ‘কনটিকি’ নামে খ্যাত। দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে সাত হাজার মাইল। অভিজ্ঞরা একবাক্যে বললেন—এক মাসের মধ্যে ডুবে যাবে কনটিকি। কোনো বড়ো ঢেউয়ের ধাক্কা ওই পলকা ভেলা সামলাতে পারবে না।
পেরুর কালাও (Callao) থেকে রারোইয়া (Raroia) এই বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করতে উদ্যোগী হলেন মাত্র পাঁচ জন সহকর্মী সঙ্গে নিয়ে। সামনে বড়ো বড়ো ঢেউ। অতন্দ্র প্রহরী হেয়ারডাল। ১৯৪৭ সালে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং নির্ধারিত স্থানে পৌঁছোতে লেগেছিল ১০১ দিন।
হেয়ারডাল প্রতিদিন অভিযানের ডায়েরি লিখে রাখতেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘কনটিকি অভিযান’ (The Kontiki Expedition) বের হল ১৯৪৮ সালে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের ৬৫ ভাষায় অনুদিত হল কনটিকির প্রায় অবিশ্বাস্য সাফল্যের কাহিনি।
হেয়ারডাল একজন নিছক অভিযাত্রী ছিলেন না। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবেও কৃতী ছিলেন। তাঁর এই অভিযানের সঙ্গে আরও বহু প্রশ্ন জড়িত। যে পলিনেশিয়ায় তিনি পৌঁছোলেন তারা কি সত্যিই দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অতীতে যাত্রা শুরু করেছিল? হেয়ারডাল মিশরের পিরামিডের গায়ে আঁকা ছবিতে একটি দৃশ্য দেখেছিলেন। জাহাজ নয়, প্যাপিরাসের কাঠি দিয়ে ছোটো নৌকো বানিয়ে মিশরীয়রা সমুদ্র যাত্রা করতেন। পেরুর লোক নিজে গিয়ে দেখলেন—পেরুবাসীরা হুবহু মিশরীয়দের মতো প্যাপিরাসের নৌকো বানিয়ে আজও নদী পারাপার করে। পেরুতেও মিশরীয়দের মতো সূর্য পূজা প্রচলিত। পেরুতেও মানুষকে মমি করে রাখা হতো। অর্থাৎ, হয় পেরুর লোকেরা মিশরে গিয়েছিলেন অথবা মিশরীয়রা পেরুতে গিয়েছিলেন। জাহাজ তখন ছিল না, নিশ্চয়ই ভেলায় চেপেই সমুদ্র পাড়ি দিত তারা।
এবার তিনি ‘রা’ নামক একটি ছোটো বোট তৈরি করে (১৯৬৯) মরক্কোর সফি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করলেন। মিশরীয় ভাষায় প্রাচীনকালে ‘রা’ বলা হত নৌকোকে। দুর্ভাগ্য তাঁর, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের দিকে গন্তব্যের সামান্য একটু আগে প্রবল ঝড়ে তাঁর ছোটো নৌকো ডুবে গেল। হতাশ হলেন না নির্ভীক হেয়ারডাল। আবার ২নং ‘রা’ বানালেন এবং যাত্রা করলেন। এবার তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন। তাঁর ২নং ‘রা’ বারবাডোমে পৌঁছে গেল নিরাপদেই। ৫২৬০ কিলোমিটার পথ একাই পাড়ি দিলেন এবং ৫৭ দিনে পৌঁছে গেলেন।
হনলুলুতে ১৯৬১ সালে যে বিশ্ব বিজ্ঞান কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হল, হেয়ারডাল সেখানে নিজের অভিজ্ঞতা যুক্তি সহ সাজিয়ে পেশ করলেন। এখানে ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীরা ছিলেন। তাঁরা সমস্বরে হেয়ারডালের প্রশংসা করলেন। তাঁর যুক্তি মেনে নিলেন।
৪১ বছর আগে নিউইয়র্কের এক্সপ্লোরার্স ক্লাব তাড়িয়ে দিয়েছিল তরুণ হেয়ারডালকে। এবার তাঁরা এগিয়ে এলেন নরওয়ের বৃদ্ধ অভিযাত্রী হেয়ারডালকে মেডাল দিয়ে সম্মানিত করতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন