চণ্ডী লাহিড়ী
সংগীতসম্রাজ্ঞী এম.এস. শুভলক্ষ্মী নিজ জীবদ্দশাতেই লিজেণ্ডে পরিণত হয়েছিলেন। জন্মেছিলেন এক হতদরিদ্র পরিবারে, যাদের পেশা ছিল ফরমায়েশি নাচ-গান পরিবেশন করা—এটা সমাজে ছিল খুবই নিকৃষ্ট পেশা। জাতিতেও এরা অচ্ছুৎ। শুভলক্ষ্মীর মা চেয়েছিলেন, মাদুরার মন্দিরের চৌহদ্দি অতিক্রম করে তাঁর কন্যা মাদ্রাজের সমঝদার সমাজে পা দিক। মেয়ে তার আরও খ্যাতিমান হোক। অভিজাত-সমঝদার বোঝাতে সেসময়কার মাদ্রাজে ব্রাহ্মণদের বোঝাত। কিন্তু অচ্ছুত সম্প্রদায়ের কোনো মেয়ের পক্ষে ব্রাহ্মণদের কাছে মান্যতা পাওয়া তো এক অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু ব্রাহ্মণ সমাজের লোক হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু পত্রিকার মালিকের পুত্র সদাশিবন গুণীর কদর করতে জানতেন। একাধিক আসরে শুভলক্ষ্মীর গান শুনে তিনি বুঝতে পারেন, এই মধুর কন্ঠের সম্ভাবনা প্রচুর। যেভাবেই হোক এই প্রতিভার সম্যক প্রকাশ তিনি ঘটাবেন। বিপদ কিন্তু অন্যদিকে, ব্রাহ্মণরা অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের গানের প্রশংসা করা তো দূরের কথা শুনতেই রাজি নয়।

এদিকে মাদুরার লোকেরা শুভলক্ষ্মী ও তাঁর মায়ের মাদ্রাজ যাওয়া পছন্দ করেননি। তাঁদের বিশ্বাস মাদুরার মন্দির ছাড়লে দেবী মীনাক্ষী রাগ করবেন। সংসারে অকল্যাণ ডেকে আনবে। তাঁরা মাদ্রাজে লোক পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে অপহরণ করে নিয়ে এলেন শুভলক্ষ্মীকে মাদুরায়।
সদাশিবন সব বুঝতে পারলেন। তিনি মাদুরায় নিয়ে গেলেন এক যাত্রাপার্টি। সেখানে শুভলক্ষ্মীও এলেন যাত্রাগান শুনতে। যাত্রাপার্টির অভিনেতারা আসলে ছিল পুলিশ। তারা অভিনয় করতে করতেই শুভলক্ষ্মীকে নিয়ে ফিরে গেলেন মাদ্রাজে। সেখানে শুভলক্ষ্মীর মা অপেক্ষা করছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, মেয়ে পয়সা ও প্রতিষ্ঠা পাক।
সদাশিবন মাদ্রাজে শুভলক্ষ্মীকে লুকিয়ে রাখলেন। ব্যবস্থা করলেন সংস্কৃত শিক্ষকের— সংস্কৃত উচ্চারণ যাতে সঠিক হয়। শুভলক্ষ্মী শুদ্ধ উচ্চারণে বিভিন্ন সংস্কৃত শ্লোক সংগীতাকারে যখন পরিবেশন করতে শুরু করলেন, কেউ তাঁর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুললেন না। খোদ রাজাগোপালাচারী শুভলক্ষ্মীর পরমভক্ত হয়ে উঠলেন। গান্ধীজি শুনলেন শুভলক্ষ্মীর কন্ঠে, গীতার শ্লোক।
এর পর রাজাজির আগ্রহে শুভলক্ষ্মীর সঙ্গে সদাশিবনের বিয়ে হল। সদাশিবনের পরিবার রক্ষণশীল হলেও গান্ধীজির উদার মানবিকতার ছোঁয়া লেগেছিল। সেজন্য সেখান থেকে কোনো বাধা এল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন