চণ্ডী লাহিড়ী
জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন অনেকেই, কিন্তু কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো অন্ধ ভক্ত খুব বেশি ছিল না। কবি কখন কোথায় যাচ্ছেন, কী লিখছেন, কোন সভায় ভাষণ দিচ্ছেন সব খুঁটিনাটি সত্যেন্দ্রনাথের নখদর্পণে। রবীন্দ্রনাথও তাঁর স্নেহদানে ছিলেন সমান অকৃপণ। ১৯১৫-তে কবি কাশ্মীর ভ্রমণে গেলেন। অন্যান্যদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গী হন। কবির ৫০ বৎসর পূর্তি উপলক্ষ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ যে সংবর্ধনা দেবেন তার প্রধান উদ্যোক্তার নাম সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। কিন্তু একটি ঘটনায় তিনি প্রথম না হয়ে দ্বিতীয় হয়ে গেলেন।

রবীন্দ্রনাথ বিলেতে গিয়ে গীতাঞ্জলি-র ইংরেজি অনুবাদ করিয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ এতই কবির ভক্ত ছিলেন, তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বলে বেড়ালেন এবার রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই নোবেল পুরস্কার পাবেন।
তারপর সত্যিই সেই অঘটন ঘটল। সত্যেন্দ্রনাথের মুখের কথা সত্য হল। কবি নোবেল পুরস্কার পেলেন।
প্রবাসী-র সহকারী সম্পাদক চারুচন্দ্র রায় লিখেছেন—সত্যেন্দ্র হঠাৎ আমার ঘরে ঢুকেই বলে উঠলেন—আমি তোমায় মারব। প্রুফ থেকে হঠাৎ মুখ তুলে দেখি, উল্লাসে সত্যেন্দ্র যেন উপচে পড়ছে। সেই আনন্দ কীসে প্রকাশ করবেন তা ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—কী এমন সুখবর যে আমায় মারতে ইচ্ছে করছে? সত্যেন্দ্র বললেন, আন্দাজ করো। সত্যেন্দ্রের হাতে একখানি এম্পায়ার খবরের কাগজ দেখে বললাম—রবিবাবু নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।
এ আন্দাজ আমি করতে পেরেছিলাম। সতেন্দ্রের কাছে আগে বহুবার এমন সম্ভাবনার কথা শুনেছিলাম বলে। সত্যেন্দ্র বললেন, আজ আর কোনো কাজ নয়। আজ ছুটি, ছুটে বেড়িয়ে যাও। আমি বলিলাম—রবিবাবুকে টেলিগ্রাম করেছ? সত্যেন্দ্র বললেন—আমি (রবিবাবুর জামাই) নগেন্দ্র গাঙ্গুলির কাছে এসপ্লানেডে শুনেই কাগজ কিনে তোমার কাছে ছুটে এসেছি। টেলিগ্রাম তো আমি করতে জানি না। তুমি যা হয় করো। তখন আমরা দু-জনে কান্তিক প্রেসে গিয়ে মণিলালকে খবর দিলাম। আর তিনজনের নামে রবিবাবুকে টেলিগ্রাম করিলাম আমাদের সানন্দ প্রণাম জানিয়ে—Nobel Prize—our pranams.
আমাদেরটা নগেনবাবুর টেলিগ্রামের পায়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁচেছিল। তাই সত্যেন্দ্র ক্ষুণ্ণ হয়ে বলেছিলেন, আমি টেলিগ্রাম করতে জানলে আমিই আগে খবর দিতে পারতাম।
রবীন্দ্রনাথকে সবার আগে নোবেলপ্রাপ্তির আনন্দ জানিয়ে টেলিগ্রাম করতে না-পারার দুঃখ সত্যেন্দ্রনাথ আমৃত্যু ভোলেননি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন