চণ্ডী লাহিড়ী
ফরাসি বিপ্লবের শুরু হয়েছিল রানি আঁতোয়ানেৎ এবং ষোড়শ লুইকে ফাঁসির মধ্য দিয়ে। ফরাসিরা তো বটেই ইতিহাসও এই দুজনের প্রতি বড়ো বেশি নির্মমতা দেখিয়েছে। উত্তরকালে এ দুজনের জীবন নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাতে এটা প্রমাণিত যে, রাজা ও রানির বিরুদ্ধে আনীত বেশির ভাগ অভিযোগই অতিরঞ্জিত। গড়পড়তা স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের আজও পড়ানো হয়, রানি আঁতোয়ানেৎ বলেছিলেন, ‘ওরা কেক খেতেই পারে।’ এ কথা রানি বলেননি। বলেছিলেন চতুর্দশ লুই-এর স্ত্রী। ষোড়শ লুই নাকি রাজ্যশাসন নিয়ে মাথাব্যথা করেননি। ফরাসিরা তাঁকে যখন গ্রেপ্তার করে তখন তাঁর নাকি ধ্যানজ্ঞান ছিল শিকার। বস্তুত তাঁর ডায়েরিতে রাজা লিখেছিলেন, কোনো হরিণ আজ শিকার করা হয়নি। তিনি কিন্তু হরিণ শিকার করতেই যাননি কারণ সরকারি কাজের চাপ ছিল।

ষোড়শ লুই এবং আঁতোয়ানেতের বিয়েটাও হয়েছিল জটিল পথে। ফ্রান্সের সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ভালো ছিল না। দুটি দেশই পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। দুটি রাজপরিবারই ছিল ইউরোপে যথেষ্ট অহঙ্কারী এবং ধনগর্বে গর্বিত। কিন্তু ফ্রান্সের রাজা বিয়েটা ঘটিয়েছিলেন প্রাশিয়াকে চাপে রাখার জন্য। প্রাশিয়ার শত্রু অস্ট্রিয়ার রানি মারিয়া থেরেসার একমাত্র কন্যা আঁতোয়ানেৎ। ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের বাবা সদ্যপরলোকগত। ঠাকুরদা তখন বার্ধক্য নিয়ে সাম্রাজ্য শাসন করছেন। পাত্র-পাত্রী বয়সে সবে কৈশোর ছুঁয়েছেন। বিয়ের সময় লুই ১৫ এবং আঁতোয়ানেৎ ১৪ বছর।
বিয়ের তারিখ ১৬ মে—১৭৭০ সাল। অনুষ্ঠানের আগে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় এবং সেজন্য আতসবাজির যে আয়োজন করা হয়েছিল, সব পন্ড হয়ে যায়। সেকালের নিয়মানুসারে ফরাসি রাজাপ্রাসাদে বালক-বালিকা বিশেষত তরুণী মেয়েদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। কারণটা হল, রাজার দুই বর্ষীয়ান বোন ছিলেন যারা বিয়ে করেননি। তরুণী মেয়ে প্রাসাদে এলে যুবরাজ তাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে পারেন—এই আশঙ্কা তাঁদের মনে ছিল প্রবল। ব্যাপারটা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে রাজার দুই চিরকুমারী বোন সদ্যবিবাহিত যুবরাজ ও যুবরানিকে একই ঘরে দীর্ঘকাল পর্যন্ত শুতে দেননি। ব্যাপারটি একদিন রাজার কানে গেল।
রাজা নি:শব্দে অন্য ব্যবস্থা করলেন। যুবরাজ ও তাঁর বউকে পাঠিয়ে দিলেন ভার্সাই প্রাসাদ ছেড়ে ক্যামপিয়েনে। সেখানে খুব ছোটো একটি প্রাসাদ ছিল। এখানে যুবরাজ প্রথম স্ত্রীর প্রেমে পড়লেন এবং তাদের দাম্পত্যজীবন শুরু হল।
লুই প্রথম থেকেই কাজ পাগল। পরোপকার ছিল তাঁর ব্রত। তরুণী রানি যখনই সম্রাটের সান্নিধ্য চান, জবাব আসে—খুব কাজে ব্যস্ত। রাত্রে তো দেখা হবেই।
একদিন এক খ্রিস্ট সন্ন্যাসিনী কালো পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে রাজার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন। সম্রাট লুই ডাকলেন তাঁকে। সন্ন্যাসিনী তাঁর পোশাকের আড়াল থেকে বললেন, তাঁদের মনাষ্টারির ছাদ ভেঙে পড়ছে, দেওয়ালের চুনকাম খসে পড়ছে। রাজাকে অনুরোধ যেন সারিয়ে দেন। রাজা বললেন—‘তিনি স্বয়ং অবস্থাটা দেখতে যাবেন।’
রাত্রে শয়নকক্ষে রানি আতোয়ানেৎ জানালেন, কষ্ট করে মনাষ্টারির দুরবস্থা দেখতে যেতে হবে না। রাজা বুঝতে পারলেন—সন্ন্যাসিনী আর কেউ নন, তাঁরই রানি আতোয়ানেৎ।
রানি আতোয়ানেৎ ছিলেন সরলবিশ্বাসী এবং স্বভাবভীরু মহিলা। ফরাসি পার্লামেন্ট সেসময় রাজার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছিল—রাজার ওপর পার্লামেন্টের আস্থা ছিল না। এসময় রানির অগোচরে কিন্তু রানিকে কেন্দ্র করে এমন একটা ঘটনা ঘটে যায় যেটা স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে স্থান পায়নি।
কার্ডিনাল দ্য রোহন ছিলেন ফ্রান্সের একজন খুবই ধনী ব্যক্তি। তাঁর ইচ্ছা ছিল ফ্রান্সের প্রধান মন্ত্রী হওয়া। কিন্তু সম্রাট লুই তাঁকে পছন্দ করতেন না। রানি আঁতোয়ানেৎ তাকে চিনতেন না। পছন্দ-অপছন্দের প্রশ্নই ওঠে না।
রানি আঁতোয়ানেতের কাছে পৌঁছোবার জন্য রোহন ভাব করলেন এক বিপজ্জনক মহিলার সঙ্গে। মেয়েটি খুবই সুন্দরী এবং পতিতা—নাম জাঁ লা মোৎ (Jeanne-La Motte), বয়স ২৮, নানারকম সাজে অতি দক্ষ। এই দুষ্ট রমণী কার্ডিনাল রোহনকে বুঝিয়েছিলেন, রানির সঙ্গে তাঁর খুবই বন্ধুত্ব। রানির মনের কথা তিনি যত জানেন, রাজাও ততটা জানেন না। বিশ্বাস হচ্ছে না? সোনার জলে রাজকীয় মোহর লাগানো কাগজে কিছু হিজিবিজি লেখা একটি চিঠিও রোহন পেলেন এই দুষ্ট রমণীর হাত দিয়ে। চিঠিতে নাকি লেখা আছে, রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময় অন্ধকারে প্রাসাদের অদূরবর্তী বাগানে চারিধারে ঘেরা গাছপালার মাঝখানে রানি গোপনে আসবেন এবং কার্ডিনাল রোহনের সঙ্গে দেখা করবেন।
ব্যাপারটি তাই ঘটলো। গভীর রাত্রের অন্ধকারে রানি সেজে জাঁ লা মোৎ ছদ্মবেশে দেখা দিলেন কার্ডিনালকে। কার্ডিনাস রানির ছদ্মবেশে জাঁর হাতে চুম্বন করলেন। কথা বলেননি অবশ্য।
কার্ডিনাল রোহনের এখন রানিকে কিছুই না দেবার নেই। জাঁ লা মোৎ এরপর একদিন বললেন—রানি এক দুষ্ঠ পরিবারকে স্বহস্তে ৫০ হাজার লিভর (ফরাসি টাকা) দান করতে চান। রোহন পঞ্চাশ হাজার লিভর জাঁকে দিলেন। জুন মাসে প্রথমে ৫০ হাজার এবং নভেম্বরে একই কায়দায় জাঁ আরও পঞ্চাশ হাজার আদায় করলেন রানির নাম ব্যবহার করে।
এরপর ষড়যন্ত্র এগোল এক সর্বনাশা পরিণতির দিকে। রাজপরিবারের জুয়েলারের টাকার প্রয়োজন। তিনি একটি ভুবনবিখ্যাত নেকলেস বিক্রি করতে চান। এই নেকলেসটির চারটি থাকে ৩৮ সেন্টিমিটার মাপের ৬৪৭টি হিরে আছে। যার দাম ১.৬ মিলিয়ন লিভর। জাঁ বোঝালেন কার্ডিনালকে—রানির ইচ্ছা লেকলেসটি কিনবেন। কিন্তু রাজা যেন জানতে না-পারেন। রানি ধীরে ধীরে টাকাটা শোধ করে দেবেন। কার্ডিনাল রোহন দেরি করলেন না। নেকলেসটি জাঁকে দিলেন, যাতে গোপনে রানিকে তিনি দেন।
জাঁ নেকলেসটি নিয়ে তার হিরে একটি করে খুলে বেচতে লাগলেন। লণ্ডনের এক জুয়েলার ২৪০,০০০ লিভার দামে অনেকটাই কিনে নিলেন। বাকিটা প্যারিসের দামি জুয়েলাররা কিনলেন। নেকলেসের মালিক জুয়েলার কিন্তু রোহনের কাছে টাকা পাননি। রোহন গ্যারান্টার দাঁড়িয়েছিল। টাকা না পেয়ে ওই জুয়েলার রোহনের পিছনে না-ঘুরে সোজা রাজার কাছে নালিশ করলেন। রানি আতোয়ানেৎ সেসময় তাঁর তৃতীয় সন্তান চার্লসের জন্ম দিয়েছেন। গহনার কোনো সংবাদই তিনি রাখেন না। রাজা বিশ্বাস করলেন রানি আঁতোয়ানেতের কথায়।
রাজার আদেশে রোহনকে গ্রেপ্তার করে বাস্তিল কারাগারে পাঠানো হল। রাজার বিচারে জাঁ যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হলেন।
পার্লামেন্ট এই ব্যাপারটি সুনজরে দেখেনি। পার্লামেন্টের অনেকেই মনে করলেন—রানি একেবারে নির্দোষ নন। পার্লামেন্টের বিচারে রোহন ছাড়া পেল। পার্লামেন্টের অনেকেই প্রকাশ্যে বলে বেড়ালেন—রানি আতোয়ানেৎ লোভী এবং দুশ্চরিত্রা রমণী।
পরবর্তীকালের গবেষণায় সবাই জেনেছেন রানি নির্দোষ। অথচ ঘটনাচক্রে তাঁকেই অপরাধী সাব্যস্ত করেছে।
অথচ জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য লুই ও আঁতোয়ানেৎ চেষ্টার ত্রুটি করেননি। বাবা পঞ্চম লুই মারা গেলেন জলবসন্তে (১০ মে ১৭৭৪), রোগটা ছোঁয়াচে—সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে যেতে দেওয়া হয়নি রোগীর ঘরে। একটি মৃদু মোমবাতির আলো রোগীর ঘরে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। রাজার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মোমবাতিটাও নিভিয়ে দেওয়া হবে। মোমবাতির নেভা দেখে রাজপুত্র (যিনি ফরাসি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী) বুঝে নেবেন—রাজা পরলোকে গেলেন।
রোমান ক্যাথলিক ধর্ম মেনে যুবরাজের করণীয় অনেক কিছু— সবই পালন করতে হবে তাঁকে। যুবরাজ লুই-এর ঠাকুরদা নব্বই বছরের আর এক লুই তখনো বেঁচে। তাঁকে পুত্রের মৃত্যুসংবাদটা জানানো জরুরি।
যাই হোক ষোড়শ লুই ও তাঁর রানি আঁতোয়ানেৎ সিংহাসনে উঠেই একটি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিলেন। ফ্রান্সের প্রাচীন রীতি অনুসারে প্রজারা চাঁদা তুলে নতুন রাজা-রানির সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে ২৪ মিলিয়ন লিভার রাজা-রানিকে উপহার দেবেন। এই টাকার জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ পড়ত। অত্যাচার করে টাকা আদায় করা হত।
নতুন রাজা-রানি প্রথাটি তুলে দিলেন। পরদিন দেখা গেল, প্যারির প্রতিটি দোকানী তাঁদের রাজা রানির ছবি দোকানে টাঙ্গিয়েছে। ব্যাস্টিল দুর্গ থেকে এক-শো বন্দিকে তাঁরা মুক্তি দিলেন। ফ্রান্সের রাস্তায় যে-সব ঘোড়ার গাড়ি চলত সেগুলি ছিল খুব ভারী, ঘোড়াদের কষ্ট হত। সেসব গাড়ি বাতিল করে আধুনিক হাল্কা গাড়ি প্রবর্তন করলেন। আগে রাজকীয় আদেশে ফরাসি মদ বিদেশে রপ্তানি বন্ধ ছিল। সিংহাসনে বসেই ষোড়শ লুই আদেশ দিলেন—‘বিদেশে মদ রপ্তানি করা যেতে পারে। তাতে বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।’ এতে ব্যবসায়ীরা হলেন বেজায় খুশি। পালাকাররা গান রচনা করলেন—স্বর্ণযুগ এসে গেছে ফ্রান্সে।
আঁতোয়ানেতের রুচি ছিল শিল্পসম্মত। রাজবাড়ির চেয়ার-টেবিল, জানালা-টেপেস্ট্রি, খাবার টেবিলের প্যাটার্ন সব নতুন করে শিল্পসম্মত করে নির্মাণ করা হয়। আঁতোয়ানেৎ যা শুরু করেন, সারা ইউরোপের নানা রাজার প্রাসাদে তারই অনুকরণ চলে। ফ্রান্সের মর্যাদা নতুন রাজদম্পতি অল্পদিনেই বহুগুণ বাড়িয়েছিলেন।
এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আঁতোয়ানেৎ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর প্রাণদন্ড হয়েছিল। সবটাই ষড়যন্ত্র। ইতিহাস বলছে, তিনি ন্যায়বিচার পাননি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন