চণ্ডী লাহিড়ী
মোগল বাদশাহদের মধ্যে প্রায় সকলেই নারীঘটিত ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। প্রত্যেকেই একাধিক বেগম এবং উপপত্নী রেখেছিলেন। প্রত্যেকের হারেমেই দেশবিদেশ থেকে সংগৃহীত সুন্দরী নারীর বসবাস ছিল। সম্রাট শাহজাহান ব্যতিক্রম নন।
শাজাহান বিয়ে করেছিলেন মমতাজ বেগমকে একথা সবাই জানেন। কিন্তু একেবারে সরকারিভাবে তাঁর আরও দুটি বউ ছিল। কিন্তু কাউকেই বেগমের মর্যাদা দেননি। দুটি বিয়েই তাঁকে করতে হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। আকবর যেমন রাজনৈতিক কারণে মান সিংহ-এর বোনকে বিয়ে করেছিলেন, অনেকটা সেরকম। এই দুই বউকে শাজাহান দিল্লিতেও কোনোদিন আনেননি। তাদের সঙ্গে বিয়ের রাত ছাড়া রাত্রিবাসও করেননি। মমতাজ বেগমের সঙ্গে শাজাহানের দাম্পত্যের মধ্যে এই যে বিশুদ্ধি এটাই তাঁদের কিংবদন্তী করে তুলেছে।
বিয়ের সময় শাজাহানের বয়স ২৩ এবং মমতাজ ২২ বছর। নওরোজ উৎসবের সন্ধ্যায় চাঁদনি চকের উৎসব-উজ্জ্বল সন্ধ্যায় দুজনে দুজনকে দেখেন। মোটামুটি ঠিক হয়ে যায়—দুজনেই যখন প্রেমমুগ্ধ বিয়েটা হবেই। মমতাজ যে অসমান্যা সুন্দরী— এ কথা তো লোকের মুখে মুখে ফিরত। বশংগৌরবও কম নয়। জাহাঙ্গিরের রাজস্বমন্ত্রী এবং পারিষদ ইতমদ-উল্লাহর নাতনি। বাদ সাধল একটি সামান্য ঘটনা। ইতমদ-উল্লাহর এক ছেলে রাজধানী থেকে বহু দূরে সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করে। সম্রাট অর্থাৎ জাহাঙ্গির বিয়েটা আটকে দিলেন। এর মাত্র কয়েক বছর পর ইতমদ-উল্লাহর মেয়ে নুরজাহানকে বিয়ে করলেন জাহাঙ্গীর। দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হল। জাহাঙ্গীর উদ্যোগী হয়ে ইতমদ উল্লা-র নাতনি মমতাজের সঙ্গে শাজাহানের বিয়ে দিলেন। বিয়ের আগে প্রেমপর্বে মমতাজের নাম ছিল আজুবঙ্গ বানো।
মমতাজ বেগমের বোনের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন শাজাহান। তাঁদের মিলনে একটি পুত্রও জন্মায়।
নিজ কন্যা জাহানারার সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক গড়েছিলেন বলে ‘বার্নিয়ে’ জানিয়েছেন।
১৬১২ সালে শাজাহানের সঙ্গে মমতাজের বিয়ে হয়। ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে চতুর্দশ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান মমতাজ। ১৯ বছর দাম্পত্যে ১৪ বার স্ত্রীকে সন্তানসম্ভবা করেন। সেকালের মানদন্ডেও এটা ব্যভিচার। সম্রাটকে মমতাজ দুশ্চরিত্র বলে সন্দেহ করতেন সেজন্য পেটে সন্তান নিয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন। আর সেই পরিশ্রমের চাপে মারা যান মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরে।
তাজমহল আর যাই হোক, প্রেমের—বিশেষত আদর্শ দাম্পত্য প্রেমের সমাধি আদৌ নয়। এটি লজ্জার। বড়োই কলঙ্কের।
মনের গভীরের পাপবোধ থেকে শাজাহান বানিয়েছিলেন তাজমহল। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন