চণ্ডী লাহিড়ী
সবাই জানেন, বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যের অতি উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা। বিদেশেও অধ্যপনায় তিনি খ্যাতকীর্তি। তাঁর কন্যারা আমার কিছু বন্ধুর হার্টথ্রব। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেড-ডিমক পথের পাঁচালি অনুবাদক হয়ে এদেশে আসেন। তাঁর কন্যাদের কোনো একজনের মারফত সেই ডিমকের সঙ্গে আমারও ঘনিষ্ঠতা হয়। বুদ্ধদেববাবুর একমাত্র পুত্রের বিয়ে হয় আনন্দবাজার পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের অন্যতম বড়োবাবু (আসলে প্রবল শান্তিনিকেতনি) ইন্দুদার মেয়ের সঙ্গে। বুদ্ধদেববাবু একবার দেশ পত্রিকার জন্য বাঙালির রন্ধন-তত্ত্ব নিয়ে তিন চার কিস্তির প্রবন্ধ লিখেছিলেন। লেখাটি দেশ-এর সাগরময় ঘোষের হাতে পড়ার আগে সন্তোষবাবুর হাতে পড়ে। বুদ্ধদেববাবুর intellectual alignment বেশি ছিল সন্তোষ ঘোষের সঙ্গে। সন্তোষবাবুর ইচ্ছা, লেখাটি আনন্দবাজারে ছাপবেন এবং চন্ডী তার অলংকরণ করবে। যাঁরা তাঁর সঙ্গে ঘর করেছেন তাঁরা জানেন সন্তোষবাবু স্বভাবে বড়োই অধৈর্য। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই আমায় ঘরে ডাকলেন। ঘরে গিয়ে আমি অপ্রস্তুত। দেখি সেই চিরকৃশকায় চিরউচ্চ মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষটি টেবিল চাপড়ে আপাততুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে তর্ক জুড়েছেন।
বরিশালী উচ্চারণে— পুঁই রান্নার কী জানেন আপনারা? বরিশালে কোথায় ভালো পুঁই হয় জানেন? লাল পুঁই দেখেছেন! সন্তোষবাবু বরিশালের লোক। বুদ্ধদেব ঢাকার। বুদ্ধদেব পূর্ব-পশ্চিম দুই বঙ্গের নানাস্থানে ভ্রমণ করেই ক্ষান্ত হননি, রন্ধন প্রণালীটাও জেনে নিতেন। সন্তোষবাবু নামেই বরিশালী, সেরা সময়টা কাটিয়েছেন কলকাতার শোভাবাজারের মেসে নয় দিল্লিতে পত্রিকার দেওয়া ফ্ল্যাটে। পুঁই রান্নার কিছুই জানেন না। সন্তোষবাবু ক্রমেই হেরে যাচ্ছেন। বুদ্ধদেববাবু বলেই চলেছেন— পুঁই সবটা সিদ্ধ করবেন না। আলু সিদ্ধ রাখবেন। চিংড়ি দেবেন না। কেবল খোলা আর মাথাগুলো দেবেন।
আমি কৌতূহলী ঘটির কান দিয়ে খুবই ভীত চোখে কোণে দাঁড়িয়ে শুনে যাচ্ছি—পুঁই রন্ধনপ্রণালী—কোন জেলায় কোন গ্রাম্য বৃদ্ধার কী রেসিপি।
বক্তার নাম বুদ্ধদেব বসু। বরিশালী সন্তোষ ঘোষ—আমার বস। শুনলে চাকরিটাই যাবে। আমি তাঁর লেখার অলংকরণ করিনি। সাগরদা সেসুযোগও দেননি। কিন্তু দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে শুধু কান নয়, গোটা জন্মটাই সার্থক। এটাই তো হঠাৎ আলোর ঝলকানি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন