চণ্ডী লাহিড়ী
সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রবাদ নিয়ে যে-কোনো আলোচনায় সর্বাগ্রে ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রুশোর নাম উঠে আসে। রুশোর লেখনিতেই প্রথম ঘোষিত হয়—ঈশ্বরের দেয়া বায়ু-জল-মাটিতে সবার সমান অধিকার। তিনিই লিখেছিলেন সেই অমোঘ ঘোষণা— কেবল জন্মকালেই সবাই সমান, তারপরই অসমান। Man is form equal, but everywhere he is in chains.
মুখে বড়ো বড়ো বৈপ্লবিক আদর্শের কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন ফরাসি ধনীদের প্রিয়পাত্র। জাঁ-জেক-রুশো (Jean Jacques Roussau) (১৭১২-১৭৭৮) জন্মেছিলেন খুব সাধারণ পরিবারে। ৩৯ বছর আগে তাঁর নামও কেউ জানতো না। এক অখ্যাত পত্রিকায় তিনি একটি প্রবন্ধ লিখে বসলেন— বিজ্ঞান ও চারুকলা ধনীদের কুক্ষিগত, সাধারণ মানুষের তাতে লাভ হয়নি। সাধারণ মানুষের সমান অধিকার আছে, ঈশ্বরদত্ত মাটি-বায়ু-ফসল সবকিছুতে। ফরাসি ধনীরা চালাক। তারা সাধারণ ঘরের এই লোভী, দুর্বল চরিত্রের মানুষটিকে অভিজাত সমাজে প্রবেশাধিকার দিলেন। অভিজাতরা তাঁকে দার্শনিক এবং নতুন সমাজের প্রবক্তা রূপে এমনভাবে প্রচার করলেন, যাতে রাতারাতি রুশো হয়ে গেলেন সেলিব্রিটি।
রুশো ছিলেন লোভী, দায়িত্ববোধহীন, ভোগী মানুষ। তাঁদের ছিল পারিবারিক ঘড়ির ব্যবসা। বাবা মা অল্পদিনেই মারা যান। বড়ো ভাই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। রুশো গ্রামের বিষয় সম্পত্তি বেচে দিয়ে চলে আসেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। এখানে এসে বৈপ্লবিক প্রবন্ধ লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেকালে সবাই অভিজাত পরিবারের আনুকূল্য লাভের জন্য যেখানে চেষ্টা চালাতেন, রুশো উল্টোপথে গিয়ে অভিজাতদের ধনের ওপর অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন।
অথচ ব্যক্তিগত জীবনে এক ধনী ফরাসি মহিলাকে বিয়ে না করে তাঁর সঙ্গে বসবাস ও সহবাস করে রুশো বেশ কয়েকটি সন্তান উৎপাদন করেন। সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের পৌঁছে দিতেন অনাথ আশ্রমে। নারী-সহবাসে তাঁর সমতুল্য কেউ সেকালের ফান্সে ছিল না। একজনকে সম্ভোগের পর তাকে ছেঁড়া জুতোর মতো ফেলে দিতেন। তাঁর সোশাল কন্ট্রাক্ট তত্ত্ব তখন এতই জনপ্রিয় যে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রকে সন্দেহ করার মতো সাহস ছিল না কারো। যে-তেরেসাকে তিনি বিয়ে না করেও ভোগ করতেন, সেই তেরেসা একবার রুশোর সঙ্গে ইংল্যাণ্ডে যান। সেখানে রুশো যখন ব্রিটিশ অভিজাতকন্যাদের সঙ্গে প্রণয়লীলায় মত্ত তখন জেমস বসওয়েল (ড. স্যামুয়েল জনসনের সঙ্গী ও জীবনীকার) সুযোগ বুঝে তেরেসাকে নিয়ে পালান। সেজন্য রুশোর সামান্য রাগ-দুঃখ ছিল না। কারণ ইংলণ্ডে তাঁর প্রচুর শয্যাসঙ্গিনী ছিল।
একজন চরিত্রহীন ভোগবিলাসে উৎসর্গীকৃত মানুষ সাম্যের কথা প্রথম প্রচার করেন। ইতিহাস তাঁর চরিত্রহীনতার কথা মনে রাখেনি, স্মরণে রেখেছে তাঁর মতবাদ। কয়েকটি উক্তি এখনও ঋষিবাক্যের মতো আমরা উচ্চারণ করিনা। রুশোর বেশ কিছু কথা এখন প্রবাদে পরিণত—অনেকেই জানি না সেসব উক্তি রুশোর।
The fruits of the earth belongs to all, the earth to none. Man is born free and everywhere in chains. Patriotism is the last resort of the scoundrel.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন