চণ্ডী লাহিড়ী
অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১-১৯৩৪) গানের জগতে প্রবাদপুরুষ। তাঁর জীবদ্দশাতেই লক্ষ্ণৌতে এ.পি. সেন রোড তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীতের মতো অতুলপ্রসাদী গানও একটি বিশেষ ঘরানাকে বহন করছে। বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে আসার পর সরাসরি এলাহাবাদে প্র্যাকটিস করতে চলে যান। গানে বিখ্যাত হওয়ায় অনেকের ধারণা, তাঁর ওকালতি তেমন জমেনি। ভুল ধারণা। মি. এ. পি. সেন ব্যর এট.ল-র শুরুতেই দুর্দান্ত প্র্যাকটিস জমেছিল। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি ‘অসামাজিক’ কাজকে বিরোধী পক্ষের আইনজীবীরা মুখরোচক সংবাদ হিসেবে এমন গুঞ্জন শুরু করেছিলেন যে তরুণ ব্যারিস্টার এলাহাবাদ ছেড়ে লক্ষ্ণৌতে বসবাস শুরু করেন। সেসময় লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে বহু গুণী বাঙালি সেখানে আসতে শুরু করায় তিনি মানসিক সখ্যতা ও শান্তি দুটোই সেখানে পান। লক্ষ্ণৌ সেসময় বাঙালি গুণী সমাবেশে সারা ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। রাধাকুমুদ ও রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, চরণদাস চট্টোপাধ্যায় (কিছু পরে) প্রভৃতি বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্য তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল।

লণ্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় অতুলপ্রসাদ নিজের মামাতো বোনের প্রেমে পড়েন ও তাকে বিয়ে করেন। হেমকুসুম দেবী ছিলেন রূপসী এবং বিদুষী। নিজের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে অতুলপ্রসাদ (সেকালীন বাঙালি সমাজের মনোভাব বুঝে) খুবই নীরব ছিলেন। একমাত্র পুত্রের দেশের বাড়িতে অকালমৃত্যুতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভেঙে পড়েন। এরপর আইন ব্যবসায়ে আর বেশি মন দেননি। মিসেস সেন উন্মাদ হয়ে যান। দেরাদুনে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। পুত্রের স্মৃতি ভোলাতে সোজা লক্ষ্ণৌ চলে যান। সেখানে শ্বেতাঙ্গদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। স্ত্রী একদিন সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে অতুলপ্রসাদ বাকি জীবন লক্ষ্ণৌতে কাটান। লক্ষ্ণৌ ছিল উত্তরপ্রদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। সিপাহী বিদ্রোহে লক্ষ্ণৌ চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার পর স্থানীয় নবাবরা আরও জিদ করে নগরটিকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। রানি ভিক্টোরিয়ার তরফ থেকেও ইংরেজ সরকার ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে পূর্ব গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হয়। সংগীতের জন্য যেমন মবিস কলেজ, চিত্রশিল্প শেখানোর জন্য অসিত কুমার হালদার লক্ষ্ণৌ যান। নতুন ব্রিটিশ সরকার বহু বাঙালি গুণীকে লক্ষ্ণৌতে বসবারের ব্যবস্থা করেন।
অতুলপ্রসাদের ইচ্ছায় লক্ষ্ণৌ প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্যসম্মেলনের স্থায়ী কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। খোদ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পারে। অতুলপ্রসাদের দাদামশাই কালীনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন খুব জনপ্রিয় কীর্তন গায়ক। বৈষ্ণবমহলে তাঁর গায়কী খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হত সেসময়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন