চণ্ডী লাহিড়ী
বাঙালি চরিত্রের অন্যতম দোষ—কেচ্ছা শুনতে খুব ভালোবাসে। ইদানীং খবরের কাগজ ও টিভির কল্যাণে কেচ্ছাপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। অতীতেও দেখা গেছে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারও আগে রাজা তুলসি গোস্বামী ইত্যাদি গুণী মানুষদের নামে কেচ্ছা ছড়িয়ে তাদের লোকসমক্ষে হেয় করা হয়েছে। খোদ জহরলাল নেহরুকেও এই কেচ্ছায় জড়িয়ে প্রচুর লেখালিখি হয়েছে।

চল্লিশের দশকে এই কেচ্ছার শিকার হয়েছিলেন বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। পূর্বেকার কেচ্ছাগুলির সঙ্গে সুরেন্দ্রনাথের কেচ্ছার পার্থক্য—এই সুরেন্দ্রনাথকে লোকচক্ষে হেয় করেছিলেন, তাঁর নিজের দুই কন্যা। বাপের সূত্র ধরেই তাঁরা একদা রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মংপু গিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেন বলেই।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধুকন্যার প্রকৃত কাহিনি জানলে আত্মহত্যা করতেন। ড. সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছয় খন্ডে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস লিখেছিলেন। ভালো ইংরেজি জানতেন। তার ফলে দেশবিদেশের বহু ছাত্র তাঁর পায়ের কাছে উপবিষ্ট হয়ে জ্ঞান আহরণ করতেন।
প্রৌঢ় বয়সে তাঁর স্ত্রী বিয়োগ ঘটে। ফলে কন্যাদের হাতে পড়েন। তাঁর বিষয়সম্পত্তি, টাকাকড়ি সর্বস্ব দিয়েও কন্যাদের ভালোবাসা পাননি। নিজ কন্যার হাতে নিয়মিত মার খেতেন ডা. দাশগুপ্ত। মাথায় বড়ো বড়ো চুল ছিল। কন্যারা সেই চুলে আলকাতরা মাখিয়ে বাপকে জব্দ করার চেষ্টা করেছিলেন। বাড়িতে বেশ কিছু ছাত্র পড়াশুনা করত। তারা অসহায়ের মতো কেবল দেখতেন।
ডা. দাশগুপ্তের মতো এত বড়ো প্রতিভার এরকম হেনস্থা দেখে প্রিয় ছাত্রী সুরমা তাঁকে বলেন, ‘বাড়ি ছেড়ে আমার সঙ্গে চলুন। রাত্রে তো আবার মারধোর শুরু হবে।’ ডা. দাশগুপ্ত প্রথমে রাজি হননি। মন ভেঙে গেছে, শরীর অবসন্ন। ব্যাঙ্কে টাকা নেই। সবই কন্যারা গ্রাস করেছে।
ডা. দাশগুপ্ত কন্যাসমা ছাত্রী সুরমাকে বললেন, ‘তুমি বয়সে তরুণী। তোমার সঙ্গে গেলে নিন্দা রটবে।’ সুরমার স্পষ্ট কথা, ‘আপনি সামাজিক সম্মান নষ্টের ভয় করছেন। আমি আপনাকে বিয়ে করব। গুরুকে বাঁচানো শিক্ষার ধর্ম।’
সুরমার সঙ্গে ডা. সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত লক্ষ্ণৌ চলে গেলেন। কলকাতায় কন্যারা প্রচার করলেন, ডা. সুরেন দাশগুপ্ত কন্যার বয়সী ছাত্রীর সঙ্গে লক্ষ্ণৌ পালিয়েছেন। বেশ মুখরোচক করেই দুই কন্যাই সমান উৎসাহে প্রচার পর্ব চালিয়ে গেলেন।
ঘটনার সময় ডা. দাশগুপ্তের অন্যতম প্রিয় ছাত্র (বর্তমানে মহামহোপাধ্যায়) অনন্তলাল ঠাকুর দাশগুপ্তের বাড়িতেই থাকতেন। পরে তিনি যখন পাটনায় পড়াচ্ছেন তখন গবেষণার জন্য সোজা লক্ষ্ণৌ চলে যেতেন। লক্ষ্ণৌতে প্রিয় সুরমাদিদি যত্ন করে আদর আপ্যায়ন করেছেন। অনন্তলালজি এখন কলকাতায়। নব্বই অতিক্রান্ত এই বয়সে তাঁর প্রিয় গুরু ডা. সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের ওপর তাঁর নিজ কন্যাদের অত্যাচারের ঘটনা স্মরণ করে আজও ব্যথিতবোধ করেন। প্রবাদপ্রতিম পন্ডিতের কথা আজ লেখা হল; একটি জাতীয় পাপমুক্তির জন্য। সংস্কৃতির মুখোশধারী কিছু মানুষের স্বরূপ প্রকাশের জন্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন