চণ্ডী লাহিড়ী
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অপরিহার্য অঙ্গ ছিল রাখিবন্ধন উৎসব। রাজস্থানে মেয়েরা তাদের স্বামী ও ভাইদের হাতে রাখি পরিয়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যেন তারা দেশের কথা, ঘরের কথা মনে রেখে বীরত্বের সঙ্গে যুধ করে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনে রাখি উৎসবের শুরু হয়েছিল—দুই বাংলার মানুষ যেন পরস্পরকে না ভোলে সেই সদিচ্ছা মাথায় রেখে প্রথম বছর যেরকম উৎসাহ নিয়ে রাখি উৎসব পালিত হয়েছিল, পরের বছর বাঙালির সহজাত ঝগড়ার জেরে সেই উৎসাহ স্তিমিত হয়ে যায়। দার্জিলিং-এ সেসময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও সিস্টার নিবেদিতা ছিলেন। তাঁরা যুক্তভাবে নিজ বুকে চাপড় মারতে মারতে সিস্টার নিবেদিতা রাখিবন্ধনের সূত্রপাত করে বলেছিলেন, ‘ধিক আমার জন্মভূমিকে। বাংলার বুকে এই যে ভেদের প্রাচীর তুলে সেদেশকে অপমানিত করেছে। যতদিন তাকে তা তুলে নিতে বাধ্য না করে, আমরা চালিয়ে যাব এ সংগ্রাম।’ সভা শেষ হতে সমবেত জনতা উঁচিয়ে ধরল তাদের ডান হাত। হাতের অরণ্যে সেই মুহূর্তে ফুটে উঠল অজস্র হলুদ ফুলের শোভা না, ফুল নয়। রাখি। প্রত্যেকের মণিবন্ধে একে অন্যকে পরিয়েছে অক্ষয় ভ্রাতৃত্ব—অবিনাশী ঐক্যের রাখি। এর পরেও। সিস্টার নিবেদিতা প্রতি বছর নিজ ভবনে, রাখিপূর্ণিমার দিন স্পেশাল স্যালাডের ব্যবস্থা করতেন।

সেসময়কার একটি ঘটনা কিংবদন্তীর রূপ নিয়েছিল। নোয়াখালির পত্রিকা সুহৃদ। সম্পাদকের বাড়ি বরিশালে। রাখিবন্ধনের দিনে তিনি মাংস রেঁধে ইয়ার বন্ধুদের ডেকে আমোদ-আহ্লাদে মাতোয়ারা। তারপর একদিন এল—বাড়িতে শ্যামাপূজা। প্রতিমা সজ্জিত। ঢাক, ঢোল, কাঁসি বাজছে। প্রসাদ, ভোগ সব তৈরি। ধূপের গন্ধে, ধুনোর ধোঁয়ায় পূজা-মন্ডপ আমোদিত। বেলা বয়ে যায়। লগ্ন শেষ হতে চলল—পুরোহিতের পাত্তা নেই। কেন?
জানা গেল পুরোহিত আসবে না। কারণ? রাখিবন্ধনের দিনের কথা এখন বুঝি মনে পড়ছে না। উপবাস, অরন্ধন, নিরামিষ ভক্ষণের দিনে সেদিনের উদ্ধত অসহযোগ, মাংসাহার, মহাভোজ—মনে পড়ছে? তারই প্রতিশোধ। অশুচি বাড়িতে পুরোহিত পুজো করবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন