চণ্ডী লাহিড়ী
এদেশে ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে বেঙ্গল স্কুল শুরু হবার আগে রাজা রবি বর্মা ছিলেন সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল নাম। পশ্চিমি পদ্ধতিতে তেল রঙে তিনি ছবি আঁকতেন। দেবদেবীর ছবি বেশি আঁকলেও সমকালীন রাজামহারাজাদের কাছ থেকেও ডাক পেতেন। বলা যেতে পারে তেল রঙে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ। তিনি ধনী জমিদার পরিবারের সন্তান। এখনকার কেরলের (ত্রিবাঙ্কুর-কোচিন স্টেট) কিলিমাঞ্জর স্টেটের তাঁরা জমিদার। বিষয়-সম্পত্তিও ছিল প্রচুর। কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকা শেখেননি। তাঁর একমাত্র ছোটো ভাই রাজা বর্মাও দাদার কাছে ছবি আঁকা শিখে যশস্বী হন। দাদা এত বেশি কাজ পেতেন যে, ছোটোভাইকে সেইসব কাজ শেষ করতে হত।

কিশোর বয়সেই ত্রিবাঙ্কুরের মহারাজা তাঁকে বীর স্রিংহলা (VIR SHRINGHALA) সম্মান ভূষিত করেন। রাজার তরফ থেকে সোনার চুড়ি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল ওই রাজ্যে এবং এটিই ছিল সর্বোচ্চ সম্মান। পরবর্তী ত্রিশ বছর রবি বর্মা ব্যবসায়ী ও রাজামহারাজাদের কাছ থেকে এত কাজ পেতে থাকেন যে, তাঁর নি:শ্বাস ফেলার সময় ছিল না। ১৮৮৮ সালে বরোদার মহারাজা তাঁকে ১৪টি পেন্টিং-এর জন্য ৫০ হাজার টাকা দেন। সেকালে এই মূল্য বিস্ময়কর।
রবি বর্মার ছবি বিদেশে গেছে। প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু সেকালে সংস্কার অনুযায়ী কেউ কালাপানি পার হয়ে বিদেশে যেতেন না। রাজা রবি বর্মাও বিদেশে যাননি। কলকাতার কোনো কোনো পত্রিকায় একবার ছাপা হয়েছিল, রবি বর্মা ওয়েস্টার্ন পেন্টিং শিখেছেন জার্মানিতে। রবি বর্মা কেবল পৌরাণিক ছবি করতেন—এটাও ভুল তথ্য।
রবি বর্মার ভাই রাজা বর্মা ভালো ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকতে পারতেন। দাদার বহুছবির পশ্চাৎপট তাঁর ভাইয়ের আঁকা এবং এমন নিখুঁত দক্ষতায় আঁকা যে দু-ভাইয়ের ছবির তফাত কোথাও ধরা যেত না।
কৃষ্ণ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ছাড়াও রামায়ণদের বহু ছবি রবি বর্মা এঁকেছেন যা লোকের ঘরে ঘরে পূজিত হয়েছে। রবি বর্মা তাঁর ছবির বহুল প্রচারের জন্য জার্মান লিথোগ্রাফিক মেশিন কিনে বোম্বেতে ছাপাখানা করেন। লিথোগ্রাফে আঁকা তাঁর ছবি সারাভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরে ঘরে তাঁর নাম পৌঁছোয়।
রবি বর্মার একটি বিখ্যাত ছবি সীতাহরণ। অনেকেই এই ছবিটা দেখেছেন। একদা কলকাতার বহুবাড়িতে এই ছবি টাঙানো থাকত, প্রবীণেরা মনে করতে পারবেন। তাঁরা এটাও মনে করতে পারবেন যে, রাবণ সীতাকে হরণের সময় একহাতে সীতার হাত চেপে ধরেছেন। অন্যহাতে তরোয়াল দিয়ে জটায়ুর ডানা কাটছেন। এই ছবিতে সীতার মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। ছবি যাতে বাস্তবানুগ হয় সেজন্য ভাইয়ের মেয়েকে (Kunjutty) মডেল করেছিলেন। সীতার ভূমিকায় তাঁর ভাইঝি লজ্জায় সেসময় নিজের কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকেন। অনেক চেষ্টা করেও তার মুখ থেকে কাপড় সরানো যায়নি।
এখানে মনে রাখতে হবে, কেরলে পুরুষেরা লুঙ্গি পরে, মেয়েরা পরে লেহেঙ্গা। রবিবর্মা বোম্বের মেয়েদের অনুকরণে পুরুষদের ধুতি এবং মেয়েদের কাছাপরা শাড়ি আঁকতেন। ভাইঝির তো শাড়ি পরা অভ্যাস নেই। সেজন্য মডেল হতে গিয়ে কিশোরী মেয়ে প্রচুর লজ্জা পায়। মুখ ঢুকে ফেলে।
রবি বর্মার একটি বিপজ্জনক নেশা ছিল, দুরন্ত হাতিকে পোষ মানানো। একবার মন্দিরের একটি পোষা হাতি খেপে গিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করে। রাজার আদেশ এল—হাতিটাকে গুলি করে হত্যা করো। রাজা রবি বর্মা, হাতিটাকে মারতে দিলেন না। সেটাকে নিনে নিয়ে গেলেন। নিজেই তাকে বশ করে চালালেন নিজের প্রাসাদ পর্যন্ত। এই হাতি পরে আরেক বার বিদ্রোহ করে। রাজা সাহেব এক কাঁদি পাকা কলা দিয়ে তাকে আদর করেন এবং পায়ের শিকল পরিয়ে দেন। আয়াপ্পনের মন্দির থেকে এনেছিলেন বলে হাতিটির নামও রেখেছিলেন আয়াপ্পন। ১৯০৬ সালে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে রবি বর্মা মারা যান।
রবি বর্মার সবার বড়ো কৃতিত্ব এই, ছবি সম্পর্কে এদেশের মানুষের কোনো চেতনা ছিল না। তিনি নিজে লিথোগ্রাফি করে হাজার হাজার ছবি সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বেঙ্গল-স্কুল রাজা রবি বর্মার কৃতিত্ব স্বীকার করে না বটে। কিন্তু এটা অস্বীকার করা যায় না— অবনীন্দ্র, নন্দলাল, ক্ষিতীন মজুমদার সবাই রবি বর্মার তৈরি বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ-নন্দলালের দল জলরং এবং টেম্পেরায় কাজ করেছেন। তেল রং-এ কাজ করেননি। সেকাজ খুবই শক্ত। অতুল বসু, বসন্ত গাঙ্গুলিরা সাহেবদের কাছে সেবিদ্যা শিখেছিলেন অনেক পরে। সেদিক থেকে, তৈলচিত্র আঁকার ব্যাপারে নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাজা রবি বর্মা এদেশে পথিকৃৎ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন