চণ্ডী লাহিড়ী
সতীদাহ উচিত না অনুচিত তাই নিয়ে হাওয়া গরম। দুই যুযুধান ব্যক্তি তোপ দাগছেন। নবদ্বীপ, ত্রিবেণী, আর ভাটপাড়ায় পন্ডিতরা কোনো না কোনো পক্ষ নিচ্ছেন। একালের মতো মুদ্রণ ব্যবস্থা সহজলভ্য ছিল না। শিক্ষিতের হার ছিল বড়োই কম। দুই পক্ষকেই নিজ মত সমর্থনের জন্য পোস্টার নয়, লিফলেট নয়—পুস্তিকা ছাপতে হত। ইংরেজরা হেলিবেরি কলেজে পড়ে চলে আসতেন ভারত শাসনের কাজে। সংস্কৃত ভাষা বা সাহিত্য দু-একজন সামান্য জানলেও, দেশজ সংস্কৃতি, প্রচলিত সংস্কার-কুসংস্কার, সমাজে ধনী ও বণিকশ্রেণির আভ্যন্তরীণ লড়াই এসব তাদের অজানা।
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ছিলেন ফোর্ট উইলিয়মের পন্ডিত। নবাগত তরুণ শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের এদেশীয় রীতিনীতি শেখানোই ছিল তাঁর কাজ। সংস্কৃত ভাষা ও দেশীয় ভাষার যেসব ইংরেজি অনুবাদ তাঁদের কন্ঠে বের হত সেগুলি প্রায়ই হত হাস্যকর।
মৃত্যুঞ্জয় ফোর্ট উইলিয়ম ছেড়ে জজ পন্ডিতের পদ পেয়েছেন। রামমোহন ভালো ইংরেজি ও ফারসি জানতেন। তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন মৃত্যুঞ্জয়ের জজ পন্ডিতের পদপ্রাপ্তিকে। জজ পন্ডিত মানে কি তিনি জজ? কাজটা তো অনুবাদকের। বলা উচিত জজের অনুবাদক। এতে মৃত্যুঞ্জয়ের চটে যাওয়াই স্বাভাবিক। মৃত্যুঞ্জয় বলেছিলেন রামমোহনের বেদান্ত সম্পর্কে তেমন জ্ঞান নেই। মৃত্যুঞ্জয় সতীদাহের বিরুদ্ধে পুস্তিকা ছাপলেন ‘পাষন্ড-পীড়ন’। রামমোহনের বুকে তখনও দুঃসহ বেদনা। তাঁর প্রিয় বৌদিকে অনিচ্ছার সঙ্গে জোর করে চিতায় তোলা হয়েছে সহমরণের নামে। বৌদির বুকে জোর করে বাঁশ চাপা দিয়ে ধরা হয়েছিল। মাথায় ডান্ডা মেরে আগেই বেহুঁশ করেছিল উৎসাহীরা। আর এই উৎসাহীদের মধ্যে ছিল গ্রাম্য পন্ডিতরা। বিচারক ম্যাকনটনের কাছে প্রথমে সতীদাহ বন্ধ করার আর্জি জানানো হয়। মাকনটনের জজ-পন্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। তিনি জজকে জানালেন—‘কেহ ইচ্ছুক হইলে সতী হইতে পারেন।’
রামমোহন পাল্টা জানালেন—তাহলে অনিচ্ছুকদের দাহ করা কেন? মৃত্যুঞ্জয় খুবই সুবিধাবাদী। তাঁর জবাব—একবার কেউ সতী হবার ইচ্ছা প্রকাশ করার পর তাকে সতী হতেই হবে। কথার খেলাপ চলবে না।
রামমোহন বই লিখলেন ‘পথ্যপ্রদান’। রামমোহন বিভিন্ন পন্ডিতসভায় নিজে হাজির থেকে মৃত্যুঞ্জয়কে চ্যালেঞ্জ করলেন—শাস্ত্রের ঠিক কোনখানে লেখা হয়েছে সতীকে বাঁশ চাপা দিয়ে আচ্ছা করে চিতার সাজানো কাঠর সঙ্গে বাঁধতে হবে। চিতায় আগুন দিয়ে জোরে ঢাক আর ঢোল পিটিয়ে সতীর কান্নার শব্দ ঢাকা দেওয়ার বিধানটাই বা কোন শাস্ত্রে কত নম্বর পাতায় লেখা আছে?
রামমোহন অবশ্য পন্ডিতবর্গের অনেকের সমর্থন পেয়েছিলেন এবং গভর্নর জেনারেল উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক পাকাপাকি সতীর নামে নারীহত্যা আইন করেই বন্ধ করে দেন।
মৃত্যুঞ্জয়কে জজ পন্ডিত কেন করা হল, তার যোগ্যতা কী? এই অপ্রিয় কথাটি বলেই রামমোহন প্রথমে মৃত্যুঞ্জয়কে চটিয়েছিলেন। নবদ্বীপের নৈয়ায়িকদের একটা বড়ো অংশ মৃত্যুঞ্জয়ের পাশে ছিলেন। যদিও নবদ্বীপে বহু বিধবা নিজ গ্রামে নিগ্রহের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত নবদ্বীপে বহিরাগত বিধবার সংখ্যা ছিল খুব বেশি। এঁরা রক্ষণশীল পন্ডিতদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বৈষ্ণব ধর্মের আশ্রয় নিতেন। সেজন্য টুলো পন্ডিতদের প্রবল উপস্থিতি সত্ত্বেও কোনো বিধবা নিগ্রহের ঘটনা সেখানে ঘটেনি। গ্রামে থাকলে এই বিধবাদের অনেককেই সতী হতে হত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন