চণ্ডী লাহিড়ী
সংগীতসাধক ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিজীবনে ছিলেন খুব শৌখিন এবং বিশুদ্ধ মর্জিবাবু। মেজাজ না এলে গান গাইবেন না। মর্জিমাফিক না হলে পোশাক পরবেন না। এবং মনের মতো না হলে খেতেও বসবেন না। গানের আসরে তাঁকে হাজির করাটাই ছিল উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যা।
একবার তাঁর পাড়ার মধ্যেই (শ্রীমানি মার্কেট) এক জলসায় তাঁর গান গাইবার কথা। ভীষ্মদেব আসবেন মধ্যরাতে। পাড়ার তরুণ গায়কেরা প্রথমার্ধে গান গাইতে শুরু করলেন। সেতারি নিতাই বসু তখন বয়সে তরুণ। অনেকক্ষণ বাজালেন তিনি। উদ্যোক্তারা বললেন—আরেকটু চালিয়ে যান। গুরু এলেন বলে। তৈরি হচ্ছেন তিনি। নিতাইবাবু নতুন একটি গৎ ধরলেন। আধঘণ্টা পর খবর এল ভীষ্মবাবু কাপড় পরছেন। এলেন বলে। আপনারা আরেকটু চালিয়ে যান। আরও পনেরো মিনিট নতুন একটা গৎ তিনি বাজালেন। উদ্যোক্তারা জানালেন—ধুতি পরেছেন। এবার পাঞ্জাবি বাছাই করছেন। দেখতে দেখতে আরও আধঘণ্টা যায়। উদ্যোক্তাদের মুখ গম্ভীর। এবার খবর এল—ভীষ্মদেব আসবেন না। যে-ধুতিটা পরেছিলেন আসরে বসে বাজাবেন বলে, তার সঙ্গে ম্যাচ করা পাঞ্জাবি পাননি। সেজন্য আবার শুয়ে পড়েছেন। দশ-বারোটা পাঞ্জাবি ধোপাবাড়ি থেকে এসেছে, কিন্তু একটাও শিল্পীর পছন্দ নয়।

আসানসোলে জলসা। ভীষ্মদেব গাইবেন। তাঁর আগে-পরে আরও গায়কেরা আছেন, তাঁরা গাইবেন এবং বাজাবেন—আসরের মধ্যমণি ভীষ্মদেব। তাঁর গান শুনতেই লোকে দূরদূরান্ত থেকে আসরের টিকিট কেটেছেন।
আসরের শুরুতে অর্থাৎ সন্ধ্যারাতে উঠতি অখ্যাত শিল্পীরা বাজালেন। অদূরে এক অতিথিশালায় বসে ভীষ্মদেব অপেক্ষা করছেন। কে গাইছে বা বাজাচ্ছে সবই সেখানে বসে তিনি জানতে পারছেন। ভীমসেন যোশী এসেছেন? এবার তাঁকে গাইতে বলো। যোশীজি আধঘণ্টা গাইলেন। এবার নতুন কেউ আসছেন। আলি আকবর। আলি আকবর তাহলে বাজাতে থাকুন। অনেকক্ষণ চালিয়ে আলি আকবর থামলেন। এবার নিশ্চয়ই ভীষ্মদেব আসবেন।
না ভীষ্মদেব এলেন না। রাতের রাগ দিনে গাইবেন না তিনি। এদিকে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তিনি। ঠিক আছে—টাকা ফেরত দিয়ে দাও। ভীষ্মদেবের নির্দেশ।
বিখ্যাত সেতারী সদ্য পরলোকগত নিতাই বসুর কাছে শোনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন