চণ্ডী লাহিড়ী
মাত্র এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি করায় কলকাতায় যে জনপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে সেটা এখন এক কিংবদন্তী। এই আন্দোলন দমন করার জন্যই পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কালিপদ মুখার্জী নিজেদের ভোগের জন্য রসগোল্লা আনিয়ে কুখ্যাত হন। রাজনীতির সঙ্গে আদৌ জড়িত নন এমন প্রবীনেরা আজও সেদিনের ঘটনাবলি স্মরণ করেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে সেএক উজ্জ্বল অধ্যায়।
১৯৫৩ সালের জুলাই মাস। এক পয়সা ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধি করার প্রতিবাদে হ্যারিসন রোডে পাঁচটি ট্রাম ক্ষিপ্ত জনতা জ্বালিয়ে দেয়। পরদিন মনুমেন্টের ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ। পুলিশ তৈরি ছিল। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের ছেড়ে আক্রমণ করল সাংবাদিক ও চিত্র-সাংবাদিকদের। অদূরে দাঁড়িয়ে ডি.সি. নির্দেশ দিচ্ছিলেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছিল। আর সেই ডামাডোলের সুযোগে দু-একজন অতিচালাক পুলিশ বিভ্রান্ত পলায়মান সাংবাদিকদের পকেট থেকে মানিব্যাগ ও পরিচয়পত্র তুলে নেয়। সেই পকেটমারির একটি জীবন্ত ছবি তোলেন যুগান্তর-অমৃতবাজারের ফটোগ্রাফার পান্না সেন। পান্নাদা ফটো তুলেই চম্পট দেন। তাকে পুলিশ ধরতে পারেনি। কিন্তু অন্য সব চিত্র সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভেঙে দেয়। পুলিশ পকেট মারছে—এই ছবি পান্নাদা কলকাতার সব কাগজকে সরবরাহ করেন।
পুলিশ বুঝতে পেরেছিল এক চিত্রসাংবাদিক পুলিশ পকেটমারির ছবি তুলেছে এবং সেতথ্য ফাঁস হয়ে গেলে বদনামের শেষ থাকবে না। সেই রাগে পান্নাদাকে না পেয়ে অন্য চিত্র-সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভাঙতে শুরু করে।
সেসময়কার একমাত্র মহিলা সাংবাদিক বিদ্যা মুন্সি (ব্লিতস) আহত হন। গুরুতর আহত হন, আনন্দবাজার-এর হরিদাস গুপ্ত, অমৃতবাজার-এর তারক দাস, যুগান্তর-এর হীরেন মিত্র। বিদ্যা মুন্সির শাড়ি টেনে নিগ্রহের ছবিটি তুলেছিলেন আনন্দবাজার-এর চিত্র-সাংবাদিক অজিত সোম।
সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার তখনও আনন্দবাজার-এর সম্পাদক। তাঁর বিখ্যাত কলম গর্জে উঠল—
‘যে পাপকে ইহারা প্রশ্রয় দিয়া লালদীঘির দপ্তরখানা এবং লালবাজারের পঙ্কিল পল্বলে দীর্ঘকাল লালন করিয়াছে, ক্লেদাক্ত সরীসৃপটি বুধবার অপরাহ্নে গড়ের মাঠে পুচ্ছ আস্ফালন করিয়া যে প্রতাপ দেখাইল সেসংবাদে সমগ্র ভারত শিহরিয়া উঠিবে। ...এণ্ডারসনীয় যুগের জঠর হইতে নির্গত জারজ সন্তানগণ স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক গভর্নমেন্টের প্রশ্রয়ে এতখানি দুর্বিনীত হইবার মতো পশু প্রকৃতির হইয়া উঠিয়াছে দুঃস্বপ্নেও ইহা কেহ কল্পনা করেন নাই।
এই কাপুরুষোচিত পরিকল্পনার নায়ক বাঙালি মন্ত্রী, বাঙালি স্থায়ী চাকুরিয়া-সচিব এবং বাঙালি পুলিশ অফিসার। ইহারা জননীর গর্ভের লজ্জা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-নীতির ঔরসে অপজাত সন্তান।’
পুলিশ মন্ত্রী কালিপদ মুখার্জীকে উদ্দেশ্য করে লেখা ‘কেলোর কীর্তি’তে সত্যেন্দ্রনাথ লিখলেন—এমন নির্লজ্জকে লজ্জা দিবার চেষ্টা করিলে স্বয়ং লজ্জাই লজ্জায় ঘোমটা টানিবে। পশুর যুক্তি দমন করিতে হইলে চাবুকের অবতারণা ছাড়া গত্যন্তর নাই।
সত্যেন্দ্রনাথের এই ধারালো প্রতিবাদের গুরুত্ব এখানেই যে—সময়টা ঘোরতর কংগ্রেসী গৌরবের সময়। পত্রিকাটি কংগ্রেসপন্থী। মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় যদিও সেসময় বিদেশে ছিলেন—তিনি আনন্দবাজারের মালিক সুরেশ মজুমদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ আপোষ করেন নি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন