চণ্ডী লাহিড়ী
ডেভিড হেয়ার ঘড়ির ব্যবসা করতেন। তাঁর বাবা এদেশে এসে প্রথম ঘড়ির ব্যবসার পত্তন করেন। তখন ইউরোপে ঘড়িকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলছে। আজকের ঘড়ির মতো সেকালের যন্ত্রটি সহজলভ্য ছিল না। যন্ত্রযুগের সেটা সবে শুরু। একমাত্র ধনীরাই ঘড়ি কিনতে ও নিয়মিত মেরামত করার ঝক্কি নিতে পারতেন।
ভারতবাসীর সময়জ্ঞান বলে কিছু ছিল না। কৃষিভিত্তিক সমাজে সূর্যের আগমন ও অস্তাচলগমনটুকু জানাই ছিল যথেষ্ট। দশটা-পাঁচটার অফিস ছিল না। সব অফিস দুপুরে বন্ধ থাকত, বিকেলে আবার খুলতো। গ্যাসলাইট জ্বালার ব্যবস্থা থাকলেও শহরের কোনো দোকান সন্ধ্যার পর খোলা থাকত না। মানুষকে সময়সচেতন করা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করা, ঠিক সময়ে আফিসে, স্কুলে আসা ইত্যাদির জন্য ঘড়ি-মনস্কতার দরকার হল।
জনসাধারণ যাতে ঘড়ি দেখে এবং ঘড়ির সময় মেনে কাজে অভ্যস্ত হন সেজন্য ধনী ব্যক্তিরা বাড়ির মাথায় ঘড়ি লাগাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কলকাতার বহু বাড়ির ছাদে টাওয়ার ক্লক ছিল।
প্রেসিডেন্সি কলেজের শীর্ষে একটি ঘড়ি ছিল, যেটি শোনা যায় রানাঘাটের পালচৌধুরিরা কলেজকে উপহার দিয়েছিলেন। পুরসভার উদ্যোগে হগ মার্কেট এবং মানিকতলা বাজারের মাথায় ঘড়ি বসানো হয়েছিল। শ্যামবাজার আপার সার্কুলার রোডের একেবারে পাঁচ রাস্তার মোড়ে, রাজা মোহনলালের বাড়ির মাথায় অচল ঘড়িটি এখনও রয়েছে।
জি.পি.ও.-র ঘড়ি এখন ডাকবিভাগের হাতে। আগে সেনাবিভাগ এটির দেখাশোনা করতো।
পুরাতন কলকাতার দুটি বিখ্যাত ঘড়ি হল দানবীর রাজেন মল্লিক এবং মানিক বসুর বাড়ির ঘড়ি। এই দুটি ঘড়িতে বেলা ১২টা বাজলেই পেটা ঘড়িতে ডং ডং করে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে আওয়াজ করা হত। সেই আওয়াজ শুনে কাঙালিরা রাজেন মল্লিক এবং মানিক বসুর বাড়ি বিনামূল্যের ভোজে লাইন দিত।
রাজেন মল্লিক এবং মানিক বসুর মধ্যে কাঙালিভোজন নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। কোন পরিবার কাঙ্গালিদের কতভাল খাওয়াতে পারে তা নিয়ে লোকমুখে নানারকম গল্প প্রচলিত ছিল। রাজেন মল্লিক এবং মানিক বসুর বাড়ির পেটা ঘড়ির ‘‘গং’’ আওয়াজ শুনে উত্তর কলকাতার লোক নিজেদের অফিস কাছারির জন্য তৈরি করত। হাতঘড়ির প্রচলন না থাকলেও বুক পকেটে বা ট্যাঁকে ঘড়ি বহনের বিলাসিতা কলকাতার বাবুদের সর্বাধুনিক ফ্যাশান। তাঁরা অনেকেই ঘড়ি মিলাতেন রাজেন মল্লিক বা মানিক বসুর বাড়ির পেটা ঘড়ির ‘গং’’ শুনে। অবশ্য রাজভবনের কামান দাগার শব্দও ছিল।
আজ টি-ভি, রেডিয়ো যুগে বালকের হাতেও হাতঘড়ি দেখা যায়। আমরা ঘড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সময়ের পিছনে ছুটছি। ডেভিড হেয়ার ও তাঁদের সমসমায়িক সাহেবরা আমাদের সময় সচেতন হতে শিখিয়েছিলেন। বই পড়ার মত ঘড়ি পড়াও ছিল একটি মূল্যবান বিদ্যা। আর এই যে ঘড়ির ব্যবসা, তার সবটাই চালাতেন স্কটল্যাণ্ডের সাহেবরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন