চণ্ডী লাহিড়ী
আমার (চ.লা.) এক ছাত্রী শৈশবে কিছুদিন ছবি আঁকা শিখেছিল, নাম অরুণা। পঞ্চাশের দশকের কথা। ভালোছাত্রী বিয়ের পর আমেরিকা চলে যায়। হঠাৎ একদিন দীর্ঘ অদর্শনের পর হাজির। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও পড়তে চায়। মাঝখানে বারো-চোদ্দো বছর পার হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে মাঝপথে স্টেটসে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্সি তাকে কোনো সর্টিফিকেট দিতে পারছে না। অনেক অধ্যাপকই মৃদু হেসে প্রত্যাখান করেছেন। আমার সঙ্গে মেয়েটি গেল আমার প্রতিবেশী অধ্যাপক নির্মল মজুমদারের বাড়ি। নির্মলবাবু অনেকদিন আগেই অবসর নিয়েছেন। চোখেও তেমন ভাল দেখেন না। নির্মলবাবু যখন শুনলেন, মেয়েটি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার কোনো রেকর্ড নেই, অথচ বিদেশে গিয়েও দীর্ঘ ব্যবধানের পর পড়তে চায়, শোনামাত্রই তাঁর চোখের অসুখ সেরে গেলে। বুকের ব্যথাও গেল কমে। মেয়েটিকে প্রশ্ন করলেন কোন ইয়ারের ছাত্রী?
অরুণা সালটা বলল।
নির্মলবাবু— নীল পাড় সাদা শাড়ি?
—হ্যাঁ, সার।
নির্মলবাবু— তোমার দুই পাশে দুটি লম্বা ছেলে বসত?
—হ্যাঁ সার। তাদের নাম...
নির্মল— তুমি আমার দুটি পেপারে নম্বর পেয়েছিলে পঁয়ত্রিশ এবং চল্লিশ।
ছাত্রী— হ্যাঁ, স্যার।
আমার চোখ বিস্ফারিত। বারো বছরে হাজারখানেক ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে অতিসাধারণ দর্শন, স্বভাব-লাজুক একজনের কথা মনে পড়ল কীভাবে!
নির্মলবাবু— শোনো অরুণা, তুমি পড়তে চাও, সেটাই বড়ো কথা। সরকারি কলেজের নানা নিয়ম থাকে। ছাত্রী সত্যিই ছিলে কি না সেটা জেনে নিলাম। শিক্ষক-ছাত্রী সম্পর্কের মাঝে সরকারি নিয়ম খাটে না। তা ছাড়া তুমি তো খুবই লাজুক।

বয়োভারে ক্লান্ত বৃদ্ধ অধ্যাপক একটু থামলেন— তোমায় পড়তেই হবে। কাল সকালেই চলে আসবে। আমি তোমায় এখনই সার্টিফিকেট দেব। যদি আটকে যায় আমার ছেলে চঞ্চল বিদেশে পড়ায়, তাকে বলে দেব। পড়া যেন আটকায় না।
ছাত্রীটির পড়া আটকায়নি। নির্মলবাবুর চিঠিতেই ভরতি হয়েছিল ও উচ্চতর ডিগ্রিও অর্জন করেছিল। উজ্জ্বল, চঞ্চল, মুকুল মজুমদারের নাম বিশ্বজোড়া। চঞ্চল ও মকুল বিদেশে বিজ্ঞান পড়িয়েছেন। উজ্জ্বলবাবু কলকাতায় থেকে গেছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন