চণ্ডী লাহিড়ী
ফণীভূষণ তর্কবাগীশ ছিলেন নিজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাইয়ের প্রত্যক্ষ ছাত্র। ফণীভূষণ অধ্যাপনা করতেন সংস্কৃত কলেজে। দেশবিশ্রুত এই অধ্যাপকের ছাত্ররা দেশবিদেশে পড়িয়ে সুনাম অর্জন করেছে। প্রাক্তন এইসব ছাত্র সংস্কৃত কলেজের পাঠ সমাপনের পরেও ফণীভূষণের কাছে মাঝে মাঝে আসতেন উচ্চতর গবেষণার জন্য। তাছাড়া গুণী মাস্টারমশাইদের কাছে আশীর্বাদ নিতে আসাও তো কর্তব্য বলে বিবেচিত হত।
একবার তাঁর কাছে এল এক প্রাক্তন ছাত্র। ফণীভূষণ পিতৃস্নেহে ছাত্রকে বসালেন। প্রশ্ন করলেন—‘এখন কোথায় পড়াচ্ছ? নতুন কোনো গবেষণায় হাত দিয়েছ?’

ছাত্রটি জানাল, বড়ো গবেষণায় সামনের বছর হাত দেবে। আপাত কয়েকটি খুচরো প্রবন্ধ লিখেছি। আপনাকে একটু দেখে দিতে হবে। ছেলেটি একটি খাতা ফণীভূষণের পায়ের কাছে রাখলেন।
ফণীভূষণ খাতাটি নিলেন না।—‘কি আছে তোমার খাতায়।’
‘বিদ্যাসাগর সংস্কৃতে যে-সব লেখা লিখেছেন তাতে আটটি ভুল পেয়েছি। সেই ভুল নিয়ে একটি প্রবন্ধ। মুদ্রণের আগে আপনি একটু দেখে দিলে...’ ফণীভূষণ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন—‘তোমার বাবা এখন কী করছেন?’
ছাত্রটি—বাবা দেশের বাড়িতেই আছেন। আমার খাতাটা—
ফণীভূষণ—তোমাদের গ্রামের চাষ আবাদ এবার কেমন?
ছাত্র—ভালো বৃষ্টি হয়েছে। চাষের অবস্থা নিশ্চয়ই ভালো। আমার খাতাটা...
ছাত্রটি যতই তার খাতার লেখাটি একবার দেখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন—ফণীভূষণ কৌশলে বিষয়ান্তরে চলে যান। অনেক চেষ্টার পর ছেলেটি খাতাটি নিয়ে চলে গেল। পরে একদিন আসবে—এমন ইঙ্গিতও দিল।
ছেলেটি চলে যাবার পর ফণীভূষণ সেদিন উপস্থিত ছাত্রদের সামনে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। হাত দুটি আকাশে তুলে বারবার বলতে লাগলেন—‘গুরু, আমার গুরু বিদ্যাসাগর। তুমি আমায় ক্ষমা করো। এই অপোগন্ড ছাত্রকে পড়িয়েছিলাম আমি। আজ গুরুনিন্দা শুনতে হল। আমার পাপ হল। আমায় ক্ষমা করো।’
উপস্থিত ছাত্ররা ফণীভূষণকে চেপে ধরে আছেন। উত্তেজনায় কাঁপছেন। গুরু নিন্দা! অনেক ছাত্র বোঝালেন। ফণীভূষণের বিলাপ থামে না। সেদিনের মতো ছাত্ররা শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। সেদিনের গুরু-ছাত্রের সম্পর্কের এই দৃষ্টান্তটি দিয়েছেন মহামহোপাধ্যায় অনন্তলাল শাস্ত্রী। ছাত্রদলে তিনিও ছিলেন।
মহামহোপাধ্যায় অনন্তলাল শাস্ত্রীর মুখে শোনা
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন