চণ্ডী লাহিড়ী
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকা থেকে ফ্রান্সে এসেছিলেন সে-দেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে। আমেরিকা তখন সদ্য স্বাধীন দেশ। অন্যদিকে তখন ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের প্রবল দাপট। স্বাধীন আমেরিকা তখন সাম্রাজ্যবাদের বহু উপসর্গ থেকে মুক্ত। পুরাতন অর্থহীন সংস্কারকে ত্যাগ করে আমেরিকা তখন নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক অন্বেষণে ব্যস্ত।
ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের প্রবল প্রতাপ। সেখানকার অভিজাতবর্গ তখনও বহু অর্থহীন নিয়মকানুনের দাস। সে-দেশের অভিজাতরা সেসময় একধরনের পোশাক পরতেন, যাকে বলা হত ফ্রককোট। পায়ে বহুকারুকার্যময় মোজা—তাতে রবারের গার্টার লাগানো। মাথায় পরতেন পরচুলা।

প্রথম যেদিন বেঞ্জামিন রাজার হাতে পরিচয়পত্র তুলে দিতে যাবেন ১৭৭৮ সালে, সেদিন দেখা গেল, তাঁর জন্য কেনা পরচুলা মাথায় ফিট করছে না। পোশাকও তাই। পরা যাচ্ছে না। হাতে সময় নেই। মাথায় পরচুলা না দিয়েই তিনি সরাসরি রাজাসভায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র অর্পণ করলেন। পরচুলা বাদ দিয়ে টাকসর্বস্ব মাথা নিয়ে রাজসভায় প্রবেশ! এ তো একরকম উলঙ্গ (Child of nature) হয়ে আসা। চারদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নামে নিন্দার স্রোত বয়ে গেল। এদিকে রাষ্ট্রদূতকে তো কোনো শাস্তিও দেওয়া যায় না। দূত অবধ্য। তাঁর এই অভব্য অশালীন আচরণ মেনে নিতেই হবে। অপমানটা বেঞ্জামিন কোনোদিন ভোলেননি।
ফ্রান্সে সামান্য কিছুদিন বসবাসের পর সেদেশে থেকেই বের করলেন তাঁর সেই বিখ্যাত পত্রিকা—Poor Richard’s Almanac। বছরের শেষে একবার প্রকাশিত হত। এই পত্রিকায় যেসব ‘সুভাষিত’ বের হত সেসব ফ্রান্সের অভিজাতরা অনেক কষ্টে হজম করতেন। এই বার্ষিক পত্রিকায় কার্টুনও প্রকাশিত হয়েছে। এ পত্রিকার কিছু কিছু বাক্য পরবর্তীকালে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
‘টাকার মূল্য যদি জানতে চাও, তাহলে টাকা ধার করো।’
‘ক্ষুধার কাছে মন্দ খাবার বলে কিছু নেই।’
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ফ্রান্সে দীর্ঘদিন বাস করলেও, ফরাসি ভাষা তেমন রপ্ত করতে পারেননি। ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে তিনি শব্দটি বোঝার চেষ্টা করতেন। আর সেই ঠোঁটের নড়াচড়া ঠিকমতো বোঝার জন্য তিনি আবিষ্কার করলেন বাই-ফোকাল চশমা। বাই-ফোকাল চশমার আবিষ্কারক হিসেবেও তিনি বিখ্যাত একথা অনেকেই জানে না।
বাড়ির মাথায় যাতে বজ্রাঘাত না হয় সেজন্য ছাদে লোহার শিক (Conductor) লাগাবার যে-ব্যবস্থা আছে তার মূলেও বিজ্ঞানী বেঞ্জামিনের উৎসাহ। তিনি মত দিলেন—লোহার শিকের অগ্রভাগটি ছুঁচালো হলে ভালো হয়। দু-চারজন ব্রিটিশবিজ্ঞানী মত দিলেন— ছুঁচলো নয়, গোল হলেই ভালো হয়।
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জ সদ্যস্বাধীন আমেরিকার প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। তাঁদেরই সাম্রাজ্য এখন হাতছাড়া। তিনি নির্দেশ দিলেন—কিছুতেই ছুঁচলো লোহার শিক নয়। সর্বত্র গোলমাথা লোহার শিক বসানো হোক।
অর্থাৎ, বেঞ্জামিন যা বলবে তার উলটো কাজ করাই ব্রিটেনের উচিত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন