চণ্ডী লাহিড়ী
১৮৪৩ সাল। চার্লস ডিকেন্সের বয়স সবে ৩১ বছর। সাহিত্যক্ষেত্রে তখনই তাঁর প্রতিপত্তি যথেষ্ট। পিকউইক পেপার্স, অলিভার টুইস্ট, নিকোলাস নিকলবি বাজারে প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। বিখ্যাত মাসিক পত্রিকায় মার্টিন চাজলেট (Martin Chuzzlewirt) নিয়মিত বের হচ্ছে। তবু প্রকাশকদের কাছ থেকে খবর পেলেন, তাঁর ধার নেওয়া হয়েছে অনেক পাউণ্ড এবং যতটা প্রচার বা নামডাক হয়েছে, বই-এর বিক্রি তত নয়। খুব আনন্দের খবর নয়। ডিকেন্স একটু ভেঙ্গে পড়লেন। লণ্ডন শহরে ঘর ভাড়া নিয়েছেন, চার সন্তানের জনক—সংসার চালাবার একটা খরচ আছে।

রাত্রে খাওয়ার পর বাড়ির সামনে গ্যাসের আলোয় সামান্য উদ্ভাসিত গলিটায় তিনি পায়চারি করেন। এই গলিটার সামান্য ভ্রমণ তাঁকে বহু কাহিনির প্লট উপহার দিয়েছে। তাঁর কল্পনাকে উসকে দেয় এই গলিপথের নির্জন ভ্রমণ। কেউ এসময় পথে থাকে না। গ্যাসের আলো তাঁর সঙ্গী। কেবল পথই আলো করে না, লেখকের মনেও আলো ফেলে।
অক্টোবর শেষ হয়ে গেল। নভেম্বরে মদু শীত টের পাওয়া যাচ্ছে। সামনে পাতা ঝরানো ডিসেম্বর—প্রবল শীতের মাস। ডিসেম্বরের কথা মনে আসতেই ক্রিসমাসের কথা মনে পড়ে গেল। গ্যসের অনুজ্জ্বল আলো পড়ল মনের মধ্যে। মনে হল—পেয়ে গেছি। পথের সন্ধান পেয়ে গেছি। ক্রিসমাসকে কেন্দ্র করে নতুন প্লট বানাতে হবে। দেরি নেই। একটুও সময় নেই। পুরো একটি মাসও হাতে নেই।
ঘরে ফিরে বসে গেলেন লিখতে। পালকের কলমে কালি তো বেশি ওঠে না। অনেক আইডিয়া। সঙ্গে সঙ্গে লিখতে না পারলে দামি আইডিয়া হারিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কলম চলতে থাকল ডিকেন্সের। তাঁর মনে হল, কেউ পিছন থেকে তাগিদ দিয়ে চলেছে। বিশ্রাম নেই।
গল্পটা ভৌতিক—কিন্তু শিশুরা খুব ভালোবাসবে। এবনেজার ক্রজ (Ebnezer Scroose) ছিল খুব কৃপণ। একটি পয়সাও সেকাউকে দান করত না। তার বন্ধু জেকব মার্লে সবেমাত্র মারা গেছে। মার্লের ভূত রোজ আসে ক্রজকে ভয় দেখাত। সৎপথে চলো, গরিবের জন্য কিছু খরচ করো। নইলে ভূতেরা কোমরে দড়ি বেঁধে তোমায় ঘোরাবে। জল থাকবে, কিন্তু খেতে পাবে না। খাবার থাকবে কিন্তু নাগালের বাইরে। কী লাভ কৃপণের জীবন যাপন করে। শেষপর্যন্ত অবশ্য ত্রুজ নিজেকে শোধন করে।
এই বই শেষ পর্যন্ত বের হল। প্রচুর পয়সা তিনি পাননি কারণ প্রকাশককে বলেছিলেন বই-এর দাম কম রাখতে। পরের সংস্করণে এই বই-এর দাম বাড়ানো হয়। এর বিক্রি এতই বেশি হয় যে, অন্য কোনো বই না লিখলেও তাঁর স্বচ্ছন্দে চলে যেত।
ডিকেন্স অবশ্য থেমে যাননি। আরও বই তিনি লিখলেন নিজের শৈশবকে ছায়াসঙ্গী করে। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ তাঁকে বিপুল পয়সা দিয়েছে। ‘গ্রেট এক্সপেকটেসন’, ‘এ টেল অব টু সিটিস’ ইত্যাদি প্রচুর পয়সা দিয়েছে। কিন্তু ডিকেন্সের আমৃত্যু ধারণা ছিল ক্রিসমাস কেবল তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বই। পয়সা না দিক সম্মান দিয়েছে।
ক্রিসমাস ক্যারল অন্যদিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ব্রিটেনে ক্রিসমাস পালিত হয় অনেকটাই ডিকেন্সের বর্ণনা অনুসারে। সবাইকে ডেকে সবাইকে নিয়ে বাড়িতে আত্মীয় বান্ধবদের সমাবেশ ঘটিয়ে যে ক্রিসমাস সেটা ডিকেন্সের অবদান। আগে প্রত্যেকে নিজের ঘরে ক্রিসমাস পালন করত। প্রতিবেশীদের সবাইকে ডেকে সামাজিক উৎসব হত না। ডিকেন্সের বই মেনে সেটা চালু হয়। শিশুদের জন্য নাম লিখে উপহার রাখার ব্যবস্থাটাও ডিকেন্সের পুস্তক অনুযায়ী। আহার্য বস্তুর যে তালিকা সেটাও ডিকেন্সের বই মেনে গৃহস্থ সংগ্রহ করে রাখে। ‘মেরি ক্রিসমাস’ কথাটি মোটে দু-একজন ব্যবহার করতেন। ডিকেন্স এই শব্দদ্বয় তাঁর গ্রন্থে ব্যবহার করার পর সারা ব্রিটেনে শব্দটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি গৃহে কথাটি লিখে রাখা নিয়ম হল। তাঁর জনপ্রিয়তা এতই বেড়েছিল যে ১৮৪০ সালে ডিকেন্স মারা গেছেন শুনে বলেছিল Dickens dead? Then will father Chrismas die too?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন