চণ্ডী লাহিড়ী
শতকের মধ্যাহ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রিয় বান্ধবী পড়ে রোমাঞ্চিত হননি এমন পাঠক-পাঠিকা বিরল। প্রবোধ সান্যালের প্রিয় বান্ধবী এবং পরে যাযাবরের দৃষ্টিপাত ছিল কিশোর ও সদ্যযুবকদের বাইবেল। প্রবোধ সান্যাল গল্প-উপন্যাসের সস্তা জনপ্রিয়তা ত্যাগ করে হিমালয় ভ্রমণে বেশি মনোযোগী হন। সৌভাগ্যক্রমে ভ্রমণ-সাহিত্যও যোগ্য লেখকের হাতে পড়ে অচিরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হিমালয় নিয়ে আগেও অনেকে লিখেছেন। সেসব নিছক ভ্রমণকাহিনি, একমাত্র প্রবোধ সান্যালের রচনাই সাহিত্যে উন্নীত হয়েছিল। তাঁর চেষ্টার সুফল এই যে মাসিক ও দৈনিক পত্রিকায় ভ্রমণ সাহিত্যের জন্য পাতা এখন সংরক্ষিত থাকছে। অনেকেই এগিয়ে আসছেন। এখন ফটোগ্রাফি এসেছে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জলধর সেন বা প্রবোধ সান্যালের যুগে ফটোগ্রাফি সহজলভ্য ছিল না।
তাঁর এই ভ্রমণ কাহিনি রচনায় সাফল্যটাও খুব সহজলভ্য ছিল না। ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেছিল, বলা উচিত ঘরে ঘরে পঠিত হয়েছিল মহাপ্রস্থানের পথে। ভারতবর্ষে এটা কয়েকটি কিস্তিতে প্রকাশিত হয়। প্রবোধকুমারের অভিজ্ঞতা—১৯৩৩ এর মে মাসে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালুম। ওঁরা বললেন ও বই আমরা ছাপতে যাব—আপনার কী মাথা খারাপ হয়েছে? ভ্রমণ কাহিনি কেউ পয়সা দিয়ে কেনে? ওই যে পাঁচ কিস্তির জন্য পঞ্চাশ টাকা দিয়েছি। ওই তো যথেষ্ট পেয়েছেন, আমি ফিরে এলাম।...
শরৎ চাটুজ্জে মশাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ বইয়ের ভূমিকা লিখবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একখানি চিঠি আমায় লিখে তিনি সরে দাঁড়ালেন। নতুন লেখকদের সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের ঔদাসীন্য আমাদের অনেকের জানা ছিল।
প্রিয় বান্ধবী লেখা যখন শেষ হয়, তখন লেখকের খুবই দুঃসময়। এক বিধবা নাতনির পুনর্বিবাহ। টাকা চাই। পান্ডুলিপি বগলে গেলেন প্রখ্যাত প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের অফিসে।...কিন্তু ওঁরা প্রকৃত ব্যবসায়ী। হৃদয়হীন বলব না। কারণ অসময়ে ওঁরা টাকা দিয়ে থাকেন। লেখকরা যখন দুঃসহ দারিদ্র্যে ছটফটিয়ে ওঁদের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়েন ওঁরা তখন নিরাশ করেন না। মাত্র তিনশো পাঁচিশ টাকায় প্রিয় বান্ধবীর কপিরাইট কিনে নিলেন। বহুকাল পরে জেনেছিলাম প্রিয় বান্ধবী উপন্যাসের কমবেশি পঁয়ত্রিশটা সংস্করণ ওরা একে একে প্রকাশ করেছেন।
অর্থের অভাবে কপিরাইট বিক্রি করা নতুন কথা নয়। এর আগেই প্রবোধকুমার গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের কাছে একটি উপন্যাস বেচে আড়াইশো টাকা পেয়ে কী আনন্দ। ‘একসঙ্গে কড়কড়ে পঁচিশখানা নোট।’
দুদিন পরেই অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে নিয়ে গেলেন লেখক।
‘আমার মতো অচিন্ত্যও বেচলো কপিরাইট নগদ দুশো পঁচাত্তর। অচিন্ত্যর জীবনেও এই প্রথম বিপুল পরিমাণ সাহিত্যকর্মের মজুরি...প্রেমেন একদিন চলল আমার সঙ্গে। প্রেমেন যে একশো পঁচিশ পেয়েছিলেন সেকথা অচিন্ত্যই লিখে গেছেন। প্রবোধকুমার একবার দারিদ্র্যের জ্বালায় কেষ্টপুর খালের জেলেদের সঙ্গে ভিড়েছিলেন। দিনের শেষে পঞ্চু তাঁর হাতে সাতটা টাকা দিয়ে বলল—আপনার এগারো টাকার মাছ আঠারো টাকায় বেচে দিলাম ঠাকুরমশাই। যথাসময়ে সেলিব্রেশন। ‘আনলেন আট আনায় একসের রাবড়ি, পাঁচ আনায় একসের চিনিপাতা দই, পয়সা পয়সা শ্রেষ্ঠ আমসন্দেশ। কে কত খাবে খাও। ছ-আনা সের কাটা রুই, ছ-আনা মাটন। রান্নাঘরে মোচ্ছব লেগে গেল।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন