চণ্ডী লাহিড়ী
বিশ্বের নানাদেশে দেখা গিয়েছে রাজতন্ত্রের পতনের জন্য রাজাদের ঘাড়ে যতটা দোষ চাপানো হয়, রাজারা সত্যিই ততটা অত্যাচারী নয়। যিনি বিজয়ী হয়ে আসেন তিনি অপসারিত রাজার বিরুদ্ধে প্রজাপীড়নের কাহিনি খুঁজে বের করেন। প্রচারের জোরে লোকে বিশ্বাস করে, অত্যাচারিত রাজা বড়ো মাপের শোষক। প্রজারা বিদ্রোহ করে তাকে অপসারণ করেছে।

রাজা জহীর শাহ যখন ১৯৪৩ সালে আফগানিস্তানের সিংহাসন থেকে বিতাড়িত হলেন তখন তাঁর বিরুদ্ধে নানারকম অত্যাচারের কাহিনি অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে প্রচারিত হয়। এর কারণ, ভারতীয় শাসকদের মাথায় তখন সিকিম দখলের কথা ঘুরছে। সিকিমের চোগিয়াল ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানে রাজি নন। অথচ চিনকে ঠেকানোর জন্য সিকিমের পূর্ণ আনুগত্য দরকার। আফগানিস্তানে রাজা জহীর শাহের অত্যাচারের কাহিনি প্রচার করে ভারত সরকার চোগিয়ালের কাছে একটা বার্তা পাঠাতে চেয়েছিলেন—চোগিয়াল, এবার তোমার পালা।
ফরাসি বিপ্লবের বহু বছর পরে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকরা শব-ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে এখন বুঝতে পারছেন রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে যাঁরা শাসনক্ষমতা দখল করেছিলেন তাঁরা অনেক বেশি হিংস্র। বিপ্লবের পর জেকোবাইটরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল রক্তপাতের হিসেবে তার নৃশংসতা ছিল অনেক বেশি। গিলোটিন যন্ত্রটা কেবল কতটা ধারালো পরীক্ষার জন্যই বহু নিরীহ নরনারীকে খুন করা হয়। প্রজাদের খুশি করতে নেপোলিয়ন তো নিজেই রাজার পোশাক পরেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসিকে বিতাড়ন করেন মুসোলিনি। নিজ প্রজাদের কাছে তিনি দেবতাসদৃশ। যুদ্ধশেষে সোভিয়েত রাশিয়া নিজ গরজে হাইলে সেলাসিকে পুরাতন সিংহাসনে ফিরিয়ে আনেন। লিগ অব নেশনসে আবিসিনিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি দৃপ্তকন্ঠে বলেছিলেন— আমরা একলাই লড়াই চালিয়ে যাব। যুদ্ধশেষে তাঁকে রাশিয়া ফিরিয়ে আনলো সিংহাসনে। কারণ আফ্রিকায় রাশিয়ার আশ্রিত বা প্রভাবিত কোনো দেশ নেই। আবিসিনিয়ায় একটু পা রাখার স্থান রাশিয়ার কপালে জুটবে। ব্যস— হাল সেলাসি খুব ভালো রাজা হয়ে গেলেন। প্রচার শুরু হল তাঁর পক্ষে। নিজেরা কমিউনিস্ট হয়েও রাশিয়া আবিসিনিয়ার রাজাকেই ফিরিয়ে আনল। কোনো কমুনিস্টকে নয়। সাধারণ মানুষ আড়ম্বর ভালোবাসে। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, একপাল দাসদাসী ইত্যাদি চোখ ধাঁধানো ব্যাপার খুব পছন্দ করে। একজন রাজাকে হত্যা করে বা বিপ্লবের নামে অপসারিত করে যিনি আসেন। তাঁদের রাজসুলভ বৈভব, বিলাস আড়ম্বর এসব চোখ ধাঁধানো রাজকীয় ব্যাপার ফিরিয়ে আনতে হয়। গোয়ালিয়র রাজবংশে আজও গোয়ালিয়রে (ভোটের মাধ্যমে) রাজত্ব করছে। পাঞ্জাবে অমরিন্দর সিং মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু তিনি তো সরাসরি রাজপুত্র। চিদাম্বরম কে? রাজবংশের বংশধর।
দিগবিজয় সিং, অর্জুন সিং—সবাই রাজরক্তের অধিকারী।
১৯১৮ সালে সার্ব, ক্রোয়াট ও শ্লোভেজদের একত্রিত করে যুগোশ্লাভিয়ার পত্তন হয়। তিনটি দেশই ছিল রাজতন্ত্র শাসিত। দ্বিতীয় যুদ্ধের পর যোশেফ ভন টিটো শাসন ক্ষমতা দখল করলেন গায়ের জোরে। কমিউনিস্টরা যাই বলুন, টিটোকে রক্তপাত ঘটিয়ে শাসন ক্ষমতা দখল করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত মার্শাল টিটো পরেছিলেন রাজাদের হার মানানো বহু মূল্যবান পোশাক। বুকে সংখ্যাতীত মেডাল। কোমরে তলোয়ার। মুখে মেকআপ। দুটি মোম লাগিয়ে উজ্জ্বল করে তোলা—বুকে কোট অব আর্মস। রাজার চেয়েও বেশি আড়ম্বর সহ তিনি সৈন্যদের স্যালুট নিতেন।
টিটো জানতেন, কম্যুনিজম নয়, প্রজারা চায় জাঁকজমক। মোগলরা চলে গেছে বহু আগে। তবু সেরা খানার নাম মোগলাই খানা, সেরা হোটেলের নাম দেওয়ান-ই-আম, কাগজে মোরা পরোটার নাম নিজামি পরোটা।
আজও বিশ্বের সব দেশে গল্প শুরু হয়—এক যে ছিল রাজা। কোথাও কোনোদিন এক যে ছিল প্রেসিডেন্ট বলে গল্প শুরু হয় না। রাজা মানেই ঐশ্বর্য। রাজা মানেই কিংবদন্তী। আজ দেখা যাচ্ছে সেরা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রনায়কের অঙ্গে রাজার চেয়েও দামি পোশাক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন