চণ্ডী লাহিড়ী

ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায় এম.বি. পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন।
না, নিজের দোষে নয়।
তখন সবে ঘোড়ায়-টানা-ট্রাম বন্ধ হয়ে ইলেকট্রিকে ট্রাম চলতে শুরু করেছে। এম.বি. পরীক্ষার দিন পনেরো আগের ঘটনা।
একদিন মেডিকেল কলেজের সামনে তিনি দাঁড়িয়ে। দেখলেন একপ্রান্ত থেকে ধেয়ে আসছে ইলেকট্রিক ট্রাম। উলটোদিক থেকে আসছে একটি ঘোড়ার গাড়ি। গাড়িতে বসে আছেন তাঁর অধ্যাপক কর্নেল পেক। ব্রুহাম গাড়ির ঘোড়া চাবুক খেয়ে ছুটেছিল ট্রামের আগে রাস্তা পেরোতে। কিন্তু ট্রামের সঙ্গে ধাক্কা লাগল ব্রুহাম গাড়ির। কেউ আহত না-হলেও ঘোড়ার গাড়িটা কিছুটা চূর্ণ হল। কর্নেল পেক প্রাণে বেঁচে গেলেন। তিনি সামনে পেলেন ছাত্র বিধানচন্দ্রকে। ট্রাম কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চান। সাক্ষী বিধানচন্দ্র। তাঁর ইংরেজ-শিক্ষককে বিধানচন্দ্র স্পষ্ট জানালেন—ট্রাম যথেষ্ট ধীরগতিতে আসছিল। ঘোড়ার গাড়ি বেশি জোরে ছুটে ট্রামকে অতিক্রম করতে যাওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দোষ তো ঘোড়ার গাড়ির।
ব্যস! কর্নেল পেক চটে আগুন। ধাত্রীবিদ্যার অধ্যাপক তিনি। অধ্যাপকের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বিধানচন্দ্র জানালেন, তিনি পেকের পক্ষে সাক্ষী দেবেন না। যা দেখেছেন সেটাই বলবেন।
কয়েকদিন পরেই মৌখিক পরীক্ষা। পরীক্ষক কর্নেল পেক। তাঁকে পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন না-করে কর্নেল চিৎকার করে উঠলেন—গেট আউট। সেবারে পরীক্ষার ফল বের হলে দেখা গেল, সব পেপারে ভালো ফল করলেও ধাত্রীবিদ্যায় ডাহা ফেল।
প্রিন্সিপাল লুকিস সব বুঝলেন কিন্তু তিনি সহকর্মীকে চটিয়ে ছাত্রের পাশে দাঁড়াতে সাহস করলেন না। ছাত্রকে তিনি বললেন, এম.বি. ডিগ্রির চেয়ে সামান্য কম গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি এল.এম.এফ.-এর জন্য বসে পড়ো। তাতে বছরটা নষ্ট হবে না। এল.এম.এফ. পরীক্ষাতেও কর্নেল পেকের হাতে খাতা গিয়েছিল কিন্তু প্রিন্সিপাল লুকিসের কঠোর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিধানচন্দ্রের কোনো ক্ষতি হল না। তা ছাড়া বিধানচন্দ্রের প্রতি পেকের অন্যায় আচরণের ঘটনাটি বাইরে যথেষ্ট প্রচার পেয়েছিল। পেক নিজেও এবার নিজের আচরণের প্রতি সতর্ক ছিলেন।
চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায় ভয়াবহ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে লেখাপড়া করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় মাত্র একটি বই কিনতে পেরেছিলেন মাত্র পাঁচ টাকায়। বাকি সব বই রাত্রি জেগে লাইব্রেরিতে বসে কপি করে নিতেন। তাঁর ছাত্রজীবনের শুরুতেই বাবা প্রকাশচন্দ্র চাকরি থেকে রিটায়ার করেন।
উপার্জনের জন্য মেল নার্সের কাজ করতেন। তাতে আয় হত দিনে আট টাকা। স্কলারশিপ ছিল মাত্র এক টাকা।
ডাক্তারি পাস করার পর যখন হাউস স্টাফ হলেন তখন হাসপাতাল থেকে পেতেন ৯৯ টাকা। প্রয়োজনের তুলনায় সেটাকাও সামান্য। মাঝে মাঝেই এসময় তিনি ট্যাক্সি চালিয়ে রোজগার করতেন। বিলেতে পড়তে যাবেন। সেজন্য টাকা জমাতেন দিবারাত্র পরিশ্রম করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন