রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যোগিনদাদার জন্ম ছিল ডেরাস্মাইলখাঁয়ে ৷
পশ্চিমেতে অনেক শহর অনেক গাঁয়ে গাঁয়ে
বেড়িয়েছিলেন মিলিটারি জরিপ করার কাজে,
শেষ বয়সে স্থিতি হল শিশুদলের মাঝে ৷
‘জুলুম তোদের সইব না আর’ হাঁক চালাতেন রোজই,
পরের দিনেই আবার চলত ওই ছেলেদের খোঁজই ৷
দরবারে তাঁর কোনো ছেলের ফাঁক পড়বার জো কী—
ডেকে বলতেন, ‘কোথায় টুনু, কোথায় গেল খোঁকি?’
‘ওরে ভজু, ওরে বাঁদর, ওরে লক্ষ্মীছাড়া’
হাঁক দিয়ে তাঁর ভারী গলায় মাতিয়ে দিতেন পাড়া ৷
চার দিকে তাঁর ছোটো বড়ো জুটত যত লোভী—
কেউ বা পেত মার্বেল, কেউ গণেশ-মার্কা ছবি,
কেউ বা লজঞ্জুস—
সেটা ছিল মজলিশে তাঁর হাজরি দেবার ঘুষ ৷
কাজলি যদি অকারণে করত অভিমান
হেসে বলতেন ‘হাঁ করো তো’, দিতেন ছাঁচিপান ৷
আপন-সৃষ্ট নাৎনিও তাঁর ছিল অনেকগুলি—
পাগলি ছিল, পটলি ছিল, আর ছিল জঙ্গুলি ৷
কেয়াখয়ের এনে দিত, দিত কাসুন্দিও—
মায়ের হাতের জারক লেবু যোগিনদাদার প্রিয় ৷
তখনো তাঁর শক্ত ছিল মুগুর-ভাঁজা দেহ—
বয়স যে ষাট পেরিয়ে গেছে, বুঝত না তা কেহ ৷
ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি, চোখদুটি জ্বলজ্বলে;
মুখ যেন তাঁর পাকা আমটি, হয় নি সে থলথলে ৷
চওড়া কপাল, সামনে মাথায় বিরল চুলের টাক,
গোঁফ জোড়াটার খ্যাতি ছিল— তাই নিয়ে তাঁর জাঁক ৷ ৷
দিন ফুরোত, কুলুঙ্গিতে প্রদীপ দিত জ্বালি;
বেলের মালা হেঁকে যেত মোড়ের মাথায় মালী ৷
চেয়ে রইতেম মুখের দিকে শান্ত শিষ্ট হয়ে;
কাঁসর ঘণ্টা উঠত বেজে গলির শিবালয়ে ৷
সেই সেকালের সন্ধ্যা মোদের সন্ধ্যা ছিল সত্যি,
দিন-ভ্যাঙানো ইলেকট্রিকের হয় নিকো উৎপত্তি ৷
ঘরের কোণে কোণে ছায়া; আঁধার বাড়ত ক্রমে—
মিটমিটে এক তেলের আলোয় গল্প উঠত জমে ৷
শুরু হলে থামতে তাঁরে দিতেম না তো ক্ষণেক,
সত্যি মিথ্যে যা-খুশি তাই বানিয়ে যেতেন অনেক ৷
ভূগোল হত উল্টোপাল্টা, কাহিনী আজগুবি—
মজা লাগত খুবই ৷
গল্পটুকু দিচ্ছি কিন্তু দেবার শক্তি নাই তো
বলার ভাবে যে রঙটুকু মন আমাদের ছাইত ৷ ৷—
হুশিয়ারপুর পেরিয়ে গেল ছন্দৌসির গাড়ি,
দেড়টা রাতে সরহরোয়ায় দিল স্টেশন ছাড়ি ৷
ভোর থাকতেই হয়ে গেল পার
বুলন্দশর, আম্লোরিসর্সার ৷
পেরিয়ে যখন ফিরোজাবাদ এল
যোগিনদাদার বিষম খিদে পেল ৷
ঠোঙায়-ভরা পকৌড়ি আর চলছে মটর-ভাজা,
এমন সময় হাজির এসে জৌনপুরের রাজা!
পাঁচশো-সাতশো লোক-লস্কর, বিশ-পঁচিশটা হাতি—
মাথার উপর ঝালর-দেওয়া প্রকাণ্ড এক ছাতি ৷
মন্ত্রী এসেই দাদার মাথায় চড়িয়ে দিল তাজ,
বললে, ‘যুবরাজ,
আর কতদিন রইবে, প্রভু, মোতিমহল ত্যেজে!’
বলতে বলতে রামশিঙা আর ঝাঁঝর উঠল বেজে ৷ ৷
ব্যাপারখানা এই—
রাজপুত্র তেরো বছর রাজভবনে নেই ৷
সদ্য ক’রে বিয়ে,
নাথদোয়ারার সেগুন-বনে শিকার করতে গিয়ে
তার পরে যে কোথায় গেল খুঁজে না পায় লোক—
কেঁদে কেঁদে অন্ধ হল রানীমায়ের চোখ ৷
খোঁজ পড়ে যায় যেমনি কিছু শোনে কানাঘুষায়;
খোঁজে পিণ্ডিদাদনখাঁয়ে, খোঁজে লালামুসায় ৷
খুঁজে খুঁজে লুধিয়ানায় ঘুরেছে পঞ্জাবে;
গুলজারপুর হয় নি দেখা, শুনছি পরে যাবে ৷
চঙ্গামঙ্গা দেখে এল সরাই আলমগিরে;
রাওলপিণ্ডি থেকে এল হতাশ হয়ে ফিরে ৷ ৷
ইতিমধ্যে যোগিনদাদা হাৎরাশ জংশনে
গেছেন লেগে চায়ের সঙ্গে পাঁউরুটি-দংশনে ৷
দিব্যি চলছে খাওয়া,
তারি সঙ্গে খোলা গায়ে লাগছে মিঠে হাওয়া—
এমন সময় সেলাম করলে জৌনপুরের চর;
জোড়হাতে কয়, ‘রাজসাহেব, কঁহা আপকা ঘর?’
দাদা ভাবলেন, সম্মানটা নিতান্ত জমকালো,
আসল পরিচয়টা তবে না দেওয়াই তো ভালো ৷
ভাবখানা তাঁর দেখে চরের ঘনালো সন্দেহ—
এ মানুষটি রাজপুত্রই, নয় কভু আর-কেহ ৷
রাজলক্ষণ এতগুলো একখানা এই গায়,
ওরে বাস রে, দেখে নি সে আর-কোনো জায়গায় ৷ ৷
তার পরে মাস-পাঁচেক গেছে দুঃখে সুখে কেটে;
হারাধনের খবর গেল জৌনপুরের স্টেটে ৷
ইস্টেশনে নির্ভাবনায় বসে আছেন দাদা—
কেমন করে কী যে হল, লাগল বিষম ধাঁধা ৷
গুর্খা ফউজ সেলাম ক’রে দাঁড়ালো চার দিকে,
ইস্টেশনটা ভরে গেল আফগানে আর শিখে ৷
ঘিরে তাঁকে নিয়ে গেল কোথায় ইটার্সিতে,
দেয় কারা সব জয়ধ্বনি উরদুতে ফার্সিতে ৷
সেখান থেকে মৈনপুরী, শেষে লছমনঝোলায়
বাজিয়ে সানাই চড়িয়ে দিল ময়ূরপংখি দোলায় ৷
দশটা কাহার কাঁধে নিল, আর পঁচিশটা কাহার
সঙ্গে ছিল তাঁহার ৷
ভাটিণ্ডাতে দাঁড় করিয়ে জোরালো দুরবিনে
দখিন মুখে ভালো করে দেখে নিলেন চিনে
বিন্ধ্যাচলের পর্বত ৷
সেইখানেতে খাইয়ে দিল কাঁচা আমের শর্বত ৷
সেখান থেকে এক পহরে গেলেন জৌনপুরে
পড়ন্ত রোদদুরে ৷ ৷
এইখানেতেই শেষে
যোগিনদাদা থেমে গেলেন যৌবরাজ্যে এসে ৷
হেসে বললেন, ‘কী আর বলব দাদা,
মাঝের থেকে মটর-ভাজা খাওয়ায় পড়ল বাধা ৷’
ও হবে না’ ‘ও হবে না’ বিষম কলরবে
ছেলেরা সব চেঁচিয়ে উঠল— ‘শেষ করতেই হবে ৷’
যোগিনদা কয়, ‘যাকগে,
বেঁচে আছি শেষ হয় নি ভাগ্যে ৷
তিনটে দিন না যেতে যেতেই হলেম গলদঘর্ম ৷
রাজপুত্র হওয়া কি, ভাই, যে-সে লোকের কর্ম?
মোটা মোটা পরোটা আর তিন-পোয়াটাক ঘি
বাংলাদেশের-হাওয়ায়-মানুষ সইতে পারে কি?
নাগরা জুতায় পা ছিঁড়ে যায়, পাগড়ি মুটের বোঝা—
এগুলি কি সহ্য করা সোজা?
তা ছাড়া এই রাজপুত্রের হিন্দি শুনে কেহ
হিন্দি ব’লেই করলে না সন্দেহ ৷
যেদিন দূরে শহরেতে চলছিল রামলীলা
পাহারাটা ছিল সেদিন ঢিলা ৷
সেই সুযোগে গৌড়বাসী তখনি এক দৌড়ে
ফিরে এল গৌড়ে,
চলে গেল সেই রাত্রেই ঢাকা—
মাঝের থেকে চর পেয়ে যায় দশটি হাজার টাকা ৷
কিন্তু গুজব শুনতে পেলেম, শেষে
কানে মোচড় খেয়ে টাকা ফেরত দিয়েছে সে ৷’
‘কেন তুমি ফিরে এলে’ চেঁচাই চারি পাশে,
যোগিনদাদা একটু কেবল হাসে ৷
তার পরে তো শুতে গেলেম; আধেক রাত্রি ধ’রে
শহরগুলোর নাম যত সব মাথার মধ্যে ঘোরে ৷
ভারতভূমির সব ঠিকানাই ভুলি যদি দৈবে
যোগিনদাদার ভূগোল-গোলা গল্প মনে রইবে ৷ ৷
আলমোড়া
জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন