রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেবী, অনেক ভক্ত এসেছে তোমার চরণতলে
অনেক অর্ঘ্য আনি;
আমি অভাগ্য এনেছি বহিয়া নয়নজলে
ব্যর্থ সাধনখানি ৷
তুমি জানো মোর মনের বাসনা,
যত সাধ ছিল সাধ্য ছিল না,
তবু বহিয়াছি কঠিন কামনা দিবসনিশি ৷
মনে যাহা ছিল হয়ে গেল আর,
গড়িতে ভাঙিয়া গেল বার বার,
ভালোয় মন্দে আলোয় আঁধার গিয়েছে মিশি ৷
তবু, ওগো দেবী, নিশিদিন করি পরানপণ
চরণে দিতেছি আনি
মোর জীবনের সকল শ্রেষ্ঠ সাধের ধন—
ব্যর্থ সাধনখানি ৷
ওগো, ব্যর্থ সাধনখানি
দেখিয়া হাসিছে সার্থকফল সকল ভক্ত-প্রাণী ৷
তুমি যদি, দেবী পলকে কেবল
কর কটাক্ষ স্নেহসুকোমল
একটি বিন্দু ফেল আঁখিজল করুণা মানি
সব হতে তবে সার্থক হবে ব্যর্থ সাধনখানি ৷ ৷
দেবী, আজি আসিয়াছে অনেক যন্ত্রী শুনাতে গান
অনেক যন্ত্র আনি ৷
আমি আনিয়াছি ছিন্নতন্ত্রী নীরব ম্লান
এই দীন বীণাখানি ৷
তুমি জান ওগো করি নাই হেলা,
পথে প্রান্তরে করি নাই খেলা,
শুধু সাধিয়াছি বসি সারাবেলা শতেক বার ৷
মনে যে গানের আছিল আভাস,
যে তান সাধিতে করেছিনু আশ,
সহিল না সেই কঠিন প্রয়াস— ছিঁড়িল তার ৷
স্তবহীন তাই রয়েছি দাঁড়ায়ে সারাটি ক্ষণ,
আনিয়াছি গীতহীনা
আমার প্রাণের একটি যন্ত্র বুকের ধন—
ছিন্নতন্ত্রী বীণা ৷
ওগো, ছিন্নতন্ত্রী বীণা
দেখিয়া তোমার গুণীজন সবে হাসিছে করিয়া ঘৃণা ৷
তুমি যদি এরে লহ কোলে তুলি
তোমার শ্রবণে উঠিবে আকুলি
সকল অগীত সংগীতগুলি হৃদয়াসীনা!—
ছিল যা আশায় ফুটাবে ভাষায় ছিন্নতন্ত্রী বীণা ৷ ৷
দেবী, এ জীবনে আমি গাহিয়াছি বসি অনেক গান,
পেয়েছি অনেক ফল;
সে আমি সবারে বিশ্বজনারে করেছি দান,
ভরেছি ধরণীতল ৷
যার ভালো লাগে সেই নিয়ে যাক,
যত দিন থাকে তত দিন থাক,
যশ অপযশ কুড়ায়ে বেড়াক ধুলার মাঝে ৷
বলেছি যে কথা করেছি যে কাজ
আমার সে নয়, সবার সে আজ—
ফিরিছে ভ্রমিয়া সংসার-মাঝ বিবিধ সাজে ৷
যা-কিছু আমার আছে আপনার শ্রেষ্ঠধন
দিতেছি চরণে আসি—
অকৃত কার্য, অকথিত বাণী, অগীত গান,
বিফল বাসনারাশি ৷
ওগো, বিফল বাসনারাশি
হেরিয়া আজিকে ঘরে পরে সবে হাসিছে হেলার হাসি ৷
তুমি যদি, দেবী, লহ কর পাতি—
আপনার হাতে রাখ মালা গাঁথি,
নিত্য নবীন রবে দিনরাতি সুবাসে ভাসি;
সফল করিবে জীবন আমার বিফল বাসনারাশি ৷ ৷
[:শান্তিনিকেতন:]
৪ কার্তিক ১৩০১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন