রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সকাল বিকাল ইসটেশনে আসি,
চেয়ে চেয়ে দেখতে ভালোবাসি,
ব্যস্ত হয়ে ওরা টিকিট কেনে;
ভাঁটির ট্রেনে কেউ বা চড়ে, কেউ বা উজান ট্রেনে ৷
সকাল থেকে কেউ বা থাকে বসে,
কেউ বা গাড়ি ফেল করে তার শেষ মিনিটের দোষে ৷—
দিনরাত গড়-গড় ঘড়-ঘড়
গাড়ি-ভরা মানুষের ছোটে ঝড় ৷
ঘন ঘন গতি তার ঘুরবে
কভু পশ্চিমে কভু পূর্বে ৷ ৷
চলচ্ছবির এই যে মূর্তিখানি
মনেতে দেয় আনি
নিত্য-মেলার নিত্য-ভোলার ভাষা—
কেবল যাওয়া-আসা ৷
মঞ্চতলে দণ্ডে পলে ভিড় জমা হয় কত—
পতাকাটা দেয় দুলিয়ে, কে কোথা হয় গত ৷
এর পিছনে সুখ দুঃখে ক্ষতি লাভের তাড়া
দেয় সবলে নাড়া ৷—
সময়ের ঘড়ি-ধরা অঙ্কেতে
ভোঁ ভোঁ ক’রে বাঁশি বাজে সংকেতে ৷
দেরি নাহি সয় কারো কিছুতেই—
কেহ যায়, কেহ থাকে পিছুতেই ৷
ওদের চলা ওদের প’ড়ে থাকায়
আর কিছু নেই, ছবির পরে কেবল ছবি আঁকায় ৷
খানিকক্ষণ যা চোখে পড়ে তার পরে যায় মুছে,
আত্ম-অবহেলার খেলা নিত্যই যায় ঘুচে ৷
ছেঁড়া পটের টুকরো জমে পথের প্রান্ত জুড়ে,
তপ্ত দিনের ক্লান্ত হাওয়ায় কোনখানে যায় উড়ে ৷
‘গেল গেল’ ব’লে যারা ফুকরে কেঁদে ওঠে
ক্ষণেক-পরে কান্না-সমেত তারাই পিছে ছোটে ৷—
ঢং ঢং বেজে ওঠে ঘণ্টা,
এসে পড়ে বিদায়ের ক্ষণটা ৷
মুখ রাখে জানালায় বাড়িয়ে,
নিমিষেই নিয়ে যায় ছাড়িয়ে ৷ ৷
চিত্রকরের বিশ্বভুবনখানি,
এই কথাটাই নিলেম মনে মানি ৷
কর্মকারের নয় এ গড়া-পেটা—
আঁকড়ে ধরার জিনিস এ নয়, দেখার জিনিস এটা ৷
কালের পরে যায় চলে কাল, হয় না কভু হারা
ছবির বাহন চলাফেরার ধারা ৷
দুবেলা সেই এ সংসারের চলতি ছবি দেখা,
এই নিয়ে রই যাওয়া-আসার ইসটেশনে একা ৷—
এক তুলি ছবিখানা এঁকে দেয়,
আর তুলি কালি তাহে মেখে দেয় ৷
আসে কারা এক দিক হতে ওই,
ভাসে কারা বিপরীত স্রোতে ওই ৷ ৷
শান্তিনিকেতন
৭ জুলাই ১৯৩৮ [:২২ আষাঢ় ’৪৫:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন