রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিনশেষ হয়ে এল, আঁধারিল ধরণী—
আর বেয়ে কাজ নাই তরণী ৷
‘হাঁগো, এ কাদের দেশে বিদেশী নামিনু এসে
তাহারে শুধানু হেসে যেমনি—
অমনি কথা না বলি ভরা ঘট ছলছলি
নতমুখে গেল চলি তরুণী ৷
এ ঘাটে বাঁধিব মোর তরণী ৷ ৷
নামিছে নীরব ছায়া ঘনবনশয়নে,
এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে ৷
স্থির জলে নাহি সাড়া, পাতাগুলি গতিহারা,
পাখি যত ঘুমে সারা কাননে—
শুধু এ সোনার সাঁঝে বিজনে পথের মাঝে
কলস কাঁদিয়া বাজে কাঁকনে ৷
এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে ৷ ৷
ঝলিছে মেঘের আলো কনকের ত্রিশূলে,
দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে ৷
শ্বেত পাথরেতে গড়া পথখানি ছায়া-করা,
ছেয়ে গেছে ঝরে-পড়া বকুলে ৷
সারি সারি নিকেতন বেড়া-দেওয়া উপবন
দেখে পথিকের মন আকুলে ৷
দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে ৷ ৷
রাজার প্রাসাদ হতে অতিদূর বাতাসে
ভাসিছে পূরবীগীতি আকাশে ৷
ধরণী সমুখপানে চলে গেছে কোনখানে,
পরান কেন কে জানে উদাসে ৷
ভালো নাহি লাগে আর আসা-যাওয়া বারবার
বহুদূর দূরাশার প্রবাসে ৷
পূরবী রাগিণী বাজে আকাশে ৷ ৷
কাননে প্রাসাদচূড়ে নেমে আসে রজনী,
আর বেয়ে কাজ নাই তরণী ৷
যদি কোথা খুঁজে পাই মাথা রাখিবার ঠাঁই
বেচা কেনা ফেলে যাই এখনি—
যেখানে পথের বাঁকে গেল চলি নত আঁখে
ভরা ঘট লয়ে কাঁখে তরুণী ৷
এই ঘাটে বাঁধো মোর তরণী ৷ ৷
[ শিলাইদহ:]
২৮ অগ্রহায়ণ ১৩০২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন