রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তবে পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে
রূপ না দিলে যদি বিধি হে?
পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া,
পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে? ৷
মনে গোপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা,
কুসুম দেয় তাই দেবতায় ৷
দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে, চাহিয়া দেখি তারে,
কী ব’লে আপনারে দিব তায়? ৷
তাই লুকায়ে থাকি সদা পাছে সে দেখে,
ভালোবাসিতে মরি শরমে ৷
রুধিয়া মনোদ্বার প্রেমের কারাগার
রচেছি আপনার মরমে ৷ ৷
যত গোপনে ভালোবাসি পরান ভরি
পরান ভরি উঠে শোভাতে ৷
যেমন কালো মেঘে অরুণ-আলো লেগে
মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে ৷ ৷
দেখো বনের ভালোবাসা আঁধারে বসি
কুসুমে আপনারে বিকাশে ৷
তারকা নিজ হিয়া তুলিছে উজলিয়া,
আপন আলো দিয়া লিখা সে ৷ ৷
ভবে প্রেমের আঁখি প্রেম কাড়িতে চাহে,
মোহন রূপ তাই ধরিছে ৷
আমি যে আপনায় ফুটাতে পারি নাই,
পরান কেঁদে তাই মরিছে ৷ ৷
আমি আপন মধুরতা আপনি জানি
পরানে আছে যাহা জাগিয়া—
তাহারে লয়ে সেথা দেখাতে পারিলে তা
যেত এ ব্যাকুলতা ভাগিয়া ৷ ৷
পাছে কুরূপ কভু তারে দেখিতে হয়,
কুরূপ দেহ-মাঝে উদিয়া,
প্রাণের এক ধারে দেহের পরপারে
তাই তো রাখি তারে রুধিয়া ৷ ৷
তাই আঁখিতে প্রকাশিতে চাহি নে তারে,
নীরবে থাকে তাই রসনা ৷
মুখে সে চাহে যত নয়ন করি নত,
গোপনে মরে কত বাসনা ৷ ৷
তাই যদি সে কাছে আসে পালাই দূরে,
আপন মনো-আশা দলে যাই—
পাছে সে মোরে দেখে থমকি বলে ‘এ কে!’
দু হাতে মুখ ঢেকে চলে যাই ৷ ৷
পাছে নয়নে বচনে সে বুঝিতে পারে
আমার জীবনের কাহিনী,
পাছে সে মনে ভানে ‘এও কি প্রেম জানে—
আমি তো এর পানে চাহি নি’ ৷ ৷
তবে পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে
রূপ না দিলে যদি বিধি হে ৷
পূজার তরে হিয়া উঠে যে ব্যাকুলিয়া,
পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে ৷ ৷
১৩ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন