রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পসারিনি, ওগো পসারিনি,
কেটেছে সকালবেলা হাটে হাটে লয়ে বিকিকিনি ৷
ঘরে ফিরিবার খনে
কী জানি কী হল মনে
বসিলি গাছের ছায়াতলে,
লাভের জমানো কড়ি
ডালায় রহিল পড়ি,
ভাবনা কোথায় ধেয়ে চলে ৷ ৷
এই মাঠ, এই রাঙা ধূলি,
অঘ্রানের-রৌদ্র-লাগা চিক্কণ কাঁঠাল-পাতাগুলি,
শীতবাতাসের শ্বাসে
এই শিহরন ঘাসে,
কী কথা কহিল তোর কানে!
বহুদূর নদীজলে
আলোকের রেখা ঝলে,
ধ্যানে তোর কোন মন্ত্র আনে ৷ ৷
সৃষ্টির প্রথম স্মৃতি হতে
সহসা আদিম স্পন্দ সঞ্চরিল তোর রক্তস্রোতে ৷
তাই এ তরুতে তৃণে
প্রাণ আপনারে চিনে
হেমন্তের মধ্যাহ্নের বেলা—
মৃত্তিকার খেলাঘরে
কত যুগ-যুগান্তরে
হিরণে হরিতে তার খেলা ৷ ৷
নিরালা মাঠের মাঝে বসি
সাম্প্রতের আবরণ মন হতে গেল দ্রুত খসি ৷
আলোকে আকাশে মিলে
যে নটন এ নিখিলে
দেখ তাই আঁখির সম্মুখে,
বিরাট কালের মাঝে
যে ওঙ্কারধ্বনি বাজে
গুঞ্জরি উঠিল তোর বুকে ৷ ৷
যত ছিল ত্বরিত আহবান
পরিচিত সংসারের দিগন্তে হয়েছে অবসান ৷
বেলা কত হল তার
বার্তা নাহি চারি ধার,
না কোথাও কর্মের আভাস—
শব্দহীনতার স্বরে
খররৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করে,
শূন্যতার উঠে দীর্ঘশ্বাস ৷ ৷
পসারিনি, ওগো পসারিনি,
ক্ষণকাল-তরে আজি ভুলে গেলি যত বিকিকিনি ৷
কোথা হাট, কোথা ঘাট,
কোথা ঘর, কোথা বাট,
মুখর দিনের কলকথা—
অনন্তের বাণী আনে
সর্বাঙ্গে সকল প্রাণে
বৈরাগ্যের স্তব্ধ ব্যাকুলতা ৷ ৷
[ খড়দহ]
৪ মাঘ ১৩৩৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন