রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দোতলার জানলা থেকে চোখে পড়ে
পুকুরের একটি কোণা ৷
ভাদ্রমাসে কানায় কানায় জল ৷
জলে গাছের গভীর ছায়া টলটল করছে
সবুজ রেশমের আভায় ৷
তীরে তীরে কলমিশাক আর হেলঞ্চ ৷
ঢালু পাড়িতে সুপারি গাছক’টা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ৷
এ ধারের ডাঙায় করবী, সাদা রঙন, একটি শিউলি—
দুটি অযত্নের রজনীগন্ধায় ফুল ধরেছে গরিবের মতো ৷
বাঁখারি-বাঁধা মেহেদির বেড়া,
তার ও পারে কলা পেয়ারা নারকেলের বাগান;
আরো দূরে গাছপালার মধ্যে একটা কোঠাবাড়ির ছাদ,
উপর থেকে শাড়ি ঝুলছে ৷
মাথায় ভিজে চাদর জড়ানো, গা-খোলা মোটা মানুষটি
ছিপ ফেলে বসে আছে বাঁধা ঘাটের পৈঁঠাতে—
ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায় কেটে ৷ ৷
বেলা পড়ে এল ৷
বৃষ্টি-ধোওয়া আকাশ,
বিকেলের প্রৌঢ় আলোয় বৈরাগ্যের ম্লানতা ৷
ধীরে ধীরে হাওয়া দিয়েছে—
টলমল করছে পুকুরের জল,
ঝিলমিল করছে বাতাবিলেবুর পাতা ৷ ৷
চেয়ে দেখি আর মনে হয়—
এ যেন আর-কোনো একটা দিনের আবছায়া,
আধুনিকের বেড়ার ফাঁক দিয়ে
দূরকালের কার একটি ছবি নিয়ে এল মনে ৷
স্পর্শ তার করুণ, স্নিগ্ধ তার কণ্ঠ,
মুগ্ধ সরল তার কালো চোখের দৃষ্টি ৷
তার সাদা শাড়ির রাঙা চওড়া পাড়
দুটি পা ঘিরে ঢেকে পড়েছে;
সে আঙিনাতে আসন বিছিয়ে দেয়,
সে আঁচল দিয়ে ধুলো দেয় মুছিয়ে,
সে আম-কাঁঠালের ছায়ায় ছায়ায় জল তুলে আনে—
তখন দোয়েল ডাকে সজনের ডালে,
ফিঙে লেজ দুলিয়ে বেড়ায় খেজুর-ঝোপে ৷
যখন তার কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসি
সে ভালো করে কিছুই বলতে পারে না,
কপাট অল্প একটু ফাঁক ক’রে পথের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—
চোখ ঝাপসা হয়ে আসে ৷ ৷
২৪ শ্রাবণ ১৩৩৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন