রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটুখানি জায়গা ছিল রান্নাঘরের পাশে,
সেইখানে মোর খেলা হত শুকনো-পারা ঘাসে ৷
একটা ছিল ছাইয়ের গাদা মস্ত ঢিবির মতো—
পোড়া কয়লা দিয়ে দিয়ে সাজিয়েছিলেম কত ৷
কেউ জানে না সেইটে আমার পাহাড় মিছিমিছি,
তারই তলায় পুঁতেছিলেম একটি তেঁতুল বিচি ৷
জন্মদিনের ঘটা ছিল, ছয় বছরের ছেলে—
সেদিন দিল আমার গাছে প্রথম পাতা মেলে ৷
চার দিকে তার পাঁচিল দিলেম কেরোসিনের টিনে;
সকাল বিকাল জল দিয়েছি দিনের পরে দিনে ৷
জল-খাবারের অংশ আমার এনে দিতেম তাকে,
কিন্তু তাহার অনেকখানিই লুকিয়ে খেত কাকে ৷
দুধ যা বাকি থাকত, দিতেম, জানত না কেউ সে তো—
পিঁপড়ে খেত কিছুটা তার, গাছ কিছু বা খেত ৷ ৷
চিকন পাতায় ছেয়ে গেল, ডাল দিল সে পেতে—
মাথায় আমার সমান হল দুই বছর না যেতে ৷
একটিমাত্র গাছ সে আমার, একটুকু সেই কোণ—
চিত্রকূটের পাহাড়তলায় সেই হল মোর বন ৷
কেউ জানে না সেখানে থাকেন অষ্টাবক্র মুনি—
মাটির ’পরে দাড়ি গড়ায়, কথা কন না উনি ৷
রাত্রে শুয়ে বিছানাতে শুনতে পেতেম কানে—
রাক্ষসেরা পেঁচার মতো চেঁচাত সেইখানে ৷ ৷
নয় বছরের জন্মদিনে তার তলে শেষ খেলা—
ডালে দিলুম ফুলের মালা সেদিন সকাল বেলা ৷
বাবা গেলেন মুন্সিগঞ্জে রানাঘাটের থেকে,
কোলকাতাতে আমায় দিলেন পিসির কাছে রেখে ৷
রাত্রে যখন শুই বিছানায় পড়ে আমার মনে
সেই তেঁতুলের গাছটি আমার আঁস্তাকুড়ের কোণে ৷
আর সেখানে নেই তপোবন, বয় না সুরধুনী—
অনেক দূরে চলে গেছেন অষ্টাবক্র মুনি ৷
[:শান্তিনিকেতন:]
৭ পৌষ ১৩৩৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন