রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যক্ষের বিরহ চলে অবিশ্রাম পথে
পবনের ধৈর্যহীন রথে
বর্ষাবাষ্পব্যাকুলিত দিগন্তে ইঙ্গিত-আমন্ত্রণে
গিরি হতে গিরিশীর্ষে, বন হতে বনে ৷
সমুৎসুক বলাকার ডানার আনন্দচঞ্চলতা,
তারি সাথে উড়ে চলে বিরহীর আগ্রহবারতা
চিরদূর স্বর্গপুরে
ছায়াছন্ন বাদলের বক্ষোদীর্ণ নিশ্বাসের সুরে ৷
নিবিড় ব্যথার সাথে পদে পদে পরমসুন্দর
পথে পথে মেলে নিরন্তর ৷ ৷
পথিক কালের মর্মে জেগে থাকে বিপুল বিচ্ছেদ;
পূর্ণতার সাথে ভেদ
মিটাতে সে নিত্য চলে ভবিষ্যের তোরণে তোরণে
নব নব জীবনে মরণে ৷
এ বিশ্ব তো তারি কাব্য, মন্দাক্রান্তে তারি রচে টীকা—
বিরাট দুঃখের পটে আনন্দের সুদূর ভূমিকা ৷
ধন্য যক্ষ সেই
সৃষ্টির-আগুন-জ্বালা এই বিরহেই ৷ ৷
হোথা বিরহিণী ও যে স্তব্ধ প্রতীক্ষায়,
দণ্ড পল গণি গণি মন্থর দিবস তার যায় ৷
সম্মুখে চলার পথ নাই,
রুদ্ধ কক্ষে তাই
আগন্তুক পান্থ লাগি ক্লান্তিভারে ধূলিশায়ী আশা ৷
কবি তারে দেয় নাই বিরহের-তীর্থ-গামী ভাষা ৷
তার তরে বাণীহীন যক্ষপুরী ঐশ্বর্যের কারা
অর্থহারা ৷ ৷
নিত্যপুষ্প, নিত্যচন্দ্রালোক,
অস্তিত্বের এত বড়ো শোক
নাই মর্তভূমে—
জাগরণ নাহি যার স্বপ্নমুগ্ধ ঘুমে ৷
প্রভুবরে যক্ষের বিরহ
আঘাত করিছে ওর দ্বারে অহরহ;
স্তব্ধগতি চরমের স্বর্গ হতে
ছায়ায়-বিচিত্র এই নানাবর্ণ মর্তের আলোতে
উহারে আনিতে চাহে
তরঙ্গিতে প্রাণের প্রবাহে ৷ ৷
কালিম্পঙ
২০ জুন ১৯৩৮
[:৫ আষাঢ় ১৩৪৫:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন