রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুদিত আলোর কমলকলিকাটিরে
রেখেছে সন্ধ্যা আঁধারপর্ণপুটে ৷
উতরিবে যবে নবপ্রভাতের তীরে
তরুণ কমল আপনি উঠিবে ফুটে ৷
উদয়াচলের সে তীর্থপথে আমি
চলেছি একেলা সন্ধ্যার অনুগামী,
দিনান্ত মোর দিগন্তে পড়ে লুটে ৷ ৷
সেই প্রভাতের স্নিগ্ধ সুদূর গন্ধ
আঁধার বাহিয়া রহিয়া রহিয়া আসে ৷
আকাশে যে গান ঘুমাইছে নিস্পন্দ
তারাদীপগুলি কাঁপিছে তাহারি শ্বাসে ৷
অন্ধকারের বিপুল গভীর আশা
অন্ধকারের ধ্যাননিমগ্ন ভাষা
বাণী খুঁজে ফিরে আমার চিত্তাকাশে ৷ ৷
জীবনের পথ দিনের প্রান্তে এসে
নিশীথের পানে গহনে হয়েছে হারা ৷
অঙ্গুলি তুলি তারাগুলি অনিমেষে
মাভৈঃ বলিয়া নীরবে দিতেছে সাড়া ৷
ম্লান দিবসের শেষের কুসুম তুলে
এ কূল হইতে নবজীবনের কূলে
চলেছি আমার যাত্রা করিতে সারা ৷ ৷
হে মোর সন্ধ্যা, যাহা-কিছু ছিল সাথে
রাখিনু তোমার অঞ্চলতলে ঢাকি ৷
আঁধারের সাথি, তোমার করুণ হাতে
বাঁধিয়া দিলাম আমার হাতের রাখী ৷
কত যে প্রাতের আশা ও রাতের গীতি
কত যে সুখের স্মৃতি ও দুখের প্রীতি
বিদায়বেলায় আজিও রহিল বাকি ৷ ৷
যা কিছু পেয়েছি, যাহা-কিছু গেল চুকে,
চলিতে চলিতে পিছে যা রহিল পড়ে,
যে মণি দুলিল যে ব্যথা বিঁধিল বুকে,
ছায়া হয়ে যাহা মিলায় দিগন্তরে,
জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা—
ধুলায় তাদের যত হোক অবহেলা
পূর্ণের পদপরশ তাদের ’পরে ৷ ৷
এলাহাবাদ
সন্ধ্যা ৷ ২ কার্তিক ৷ [:১৩২১:]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন