রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বহুদিন হল কোন ফাল্গুনে ছিনু আমি তব ভরসায়,
এলে তুমি ঘন বরষায় ৷
আজি উত্তাল তুমুল ছন্দে
আজি নবঘন-বিপুলমন্দ্রে
আমার পরানে যে গান বাজাবে সে গান তোমার করো সায়—
আজি জলভরা বরষায় ৷ ৷
দূরে একদিন দেখেছিনু তব কনকাঞ্চল-আবরণ,
নবচম্পক-আভরণ ৷
কাছে এলে যবে হেরি অভিনব
ঘোর ঘননীল গুণ্ঠন তব,
চলচপলার চকিত চমকে করিছে চরণ বিচরণ—
কোথা চম্পক-আভরণ ৷ ৷
সেদিন দেখেছি, খনে খনে তুমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে বনতল,
নুয়ে নুয়ে যেত ফুলদল ৷
শুনেছিনু যেন মৃদু রিনিরিনি
ক্ষীণ কটি ঘেরি বাজে কিঙ্কিণী,
পেয়েছিনু যেন ছায়াপথে যেতে তব নিশ্বাসপরিমল—
ছুঁয়ে যেতে যবে বনতল ৷ ৷
আজি আসিয়াছ ভুবন ভরিয়া, গগনে ছড়ায়ে এলো চুল,
চরণে জড়ায়ে বনফুল ৷
ঢেকেছে আমারে তোমার ছায়ায়
সঘন সজল বিশাল মায়ায়,
আকুল করেছ শ্যামসমারোহে হৃদয়সাগর-উপকূল—
চরণে জড়ায়ে বনফুল ৷ ৷
ফাল্গুনে আমি ফুলবনে বসে গেঁথেছিনু যত ফুলহার
সে নহে তোমার উপহার ৷
যেথা চলিয়াছ সেথা পিছে পিছে
স্তবগান তব আপনি ধ্বনিছে,
বাজাতে শেখে নি সে গানের সুর এ ছোটো বীণার ক্ষীণ তার—
এ নহে তোমার উপহার ৷ ৷
কে জানিত সেই ক্ষণিকা মুরতি দূরে করি দিবে বরষন,
মিলাবে চপল দরশন ৷
কে জানিত মোরে এত দিবে লাজ,
তোমার যোগ্য করি নাই সাজ,
বাসরঘরের দুয়ারে করালে পূজার অর্ঘ্য বিরচন—
একি রূপে দিলে দরশন ৷ ৷
ক্ষমা করো তবে ক্ষমা করো মোর আয়োজনহীন পরমাদ,
ক্ষমা করো যত অপরাধ ৷
এই ক্ষণিকের পাতার কুটিরে
প্রদীপ-আলোকে এসো ধীরে ধীরে,
এই বেতসের বাঁশিতে পড়ুক তব নয়নের পরসাদ—
ক্ষমা করো যত অপরাধ ৷ ৷
আস নাই তুমি নবফাল্গুনে ছিনু যবে তব ভরসায়,
এসো এসো ভরা বরষায় ৷
এসো গো গগনে আঁচল লুটায়ে,
এসো গো সকল স্বপন ছুটায়ে,
এ পরান ভরি যে গান বাজাবে সে গান তোমার করো সায়—
আজি জলভরা বরষায় ৷ ৷
[ শিলাইদহ:]
১০ আষাঢ় [১৩০৭]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন