রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সকল বেলা কাটিয়া গেল, বিকাল নাহি যায় ৷
দিনের শেষে শ্রান্তছবি কিছুতে যেতে চায় না রবি,
চাহিয়া থাকে ধরণী-পানে— বিদায় নাহি চায় ৷ ৷
মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে, মিলায়ে থাকে মাঠে,
পড়িয়া থাকে তরুর শিরে, কাঁপিতে থাকে নদীর নীরে—
দাঁড়ায়ে থাকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে ৷ ৷
এখনো ঘুঘু ডাকিছে ডালে করুণ একতানে ৷
অলস দুখে দীর্ঘদিন ছিল সে বসে মিলনহীন,
এখনো তার বিরহগাথা বিরাম নাহি মানে ৷ ৷
বধূরা দেখো আইল ঘাটে, এল না ছায়া তবু ৷
কলসঘায়ে ঊর্মি টুটে, রশ্মিরাশি চূর্ণি উঠে,
শ্রান্ত বায়ু প্রান্তনীর চুম্বি যায় কভু ৷ ৷
দিবসশেষে বাহিরে এসে সেও কি এতখনে
নীলাম্বরে অঙ্গ ঘিরে নেমেছে সেই নিভৃত নীরে
প্রাচীরে-ঘেরা ছায়াতে-ঢাকা বিজন ফুলবনে? ৷
স্নিগ্ধ জল মুগ্ধভাবে ধরেছে তনুখানি ৷
মধুর দুটি বাহুর ঘায় অগাধ জল টুটিয়া যায়,
গ্রীবার কাছে নাচিয়া উঠি করিছে কানাকানি ৷ ৷
কপোলে তার কিরণ প’ড়ে তুলেছে রাঙা করি,
মুখের ছায়া পড়িয়া জলে নিজেরে যেন খুঁজিছে ছলে,
জলের ’পরে ছড়ায়ে পড়ে আঁচল খসি পড়ি ৷ ৷
জলের ’পরে এলায়ে দিয়ে আপন রূপখানি,
শরমহীন আরামসুখে হাসিটি ভাসে মধুর মুখে,
বনের ছায়া ধরার চোখে দিয়েছে পাতা টানি ৷ ৷
সলিলতলে সোপান-’পরে উদাস বেশবাস ৷
আধেক কায়া আধেক ছায়া জলের ’পরে রচিছে মায়া,
দেহেরে যেন দেহের ছায়া করিছে পরিহাস ৷ ৷
আম্রবন মুকুলে-ভরা গন্ধ দেয় তীরে ৷
গোপন শাখে বিরহী পাখি আপন-মনে উঠিছে ডাকি,
বিবশ হয়ে বকুল ফুল খসিয়া পড়ে নীরে ৷ ৷
দিবস ক্রমে মুদিয়া আসে, মিলায়ে আসে আলো ৷
নিবিড় ঘন বনের রেখা আকাশশেষে যেতেছে দেখা,
নিদ্রালস আঁখির ’পরে ভুরুর মতো কালো ৷ ৷
বুঝি-বা তীরে উঠিয়াছে সে জলের কোল ছেড়ে ৷
ত্বরিত পদে চলেছে গেহে, সিক্ত বাস লিপ্ত দেহে—
যৌবনলাবণ্য যেন লইতে চাহে কেড়ে ৷ ৷
মাজিয়া তনু যতন ক’রে পরিবে নব বাস ৷
কাঁচল পরি আঁচল টানি আঁটিয়া লয়ে কাঁকনখানি
নিপুণ করে রচিয়া বেণী বাঁধিবে কেশপাশ ৷ ৷
উরসে পরি’ যূথীর হাব বসনে মাথা ঢাকি
বনের পথে নদীর তীরে অন্ধকারে বেড়াবে ধীরে
গন্ধটুকু সন্ধ্যাবায়ে রেখার মতো রাখি ৷ ৷
বাজিবে তার চরণধ্বনি বুকের শিরে শিরে ৷
কখন কাছে না আসিতে সে পরশ যেন লাগিবে এসে,
যেমন ক’রে দখিনবায় জাগায় ধরণীরে ৷ ৷
যেমনি কাছে দাঁড়াব গিয়ে আর কি হবে কথা!
ক্ষণেক শুধু অবশকায় থমকি রবে ছবির প্রায়,
মুখের পানে চাহিয়া শুধু সুখের আকুলতা ৷ ৷
দোঁহার মাঝে ঘুচিয়া যাবে আলোর ব্যবধান ৷
আঁধারতলে গুপ্ত হয়ে বিশ্ব যাবে লুপ্ত হয়ে,
আসিবে মুদে লক্ষকোটি জাগ্রত নয়ান ৷ ৷
অন্ধকারে নিকট করে, আলোতে করে দূর ৷
যেমন দুটি ব্যথিত প্রাণে দুঃখনিশি নিকটে টানে—
সুখের প্রাতে যাহারা রহে আপনা-ভরপুর ৷ ৷
আঁধারে যেন দুজনে আর দুজন নাহি থাকে ৷
হৃদয়-মাঝে যতটা চাই ততটা যেন পুরিয়া পাই,
প্রলয়ে যেন সকল যায়— হৃদয় বাকি রাখে ৷ ৷
হৃদয় দেহ আঁধারে যেন হয়েছে একাকার ৷
মরণ যেন অকালে আসি দিয়েছে সব বাঁধন নাশি,
ত্বরিতে যেন গিয়েছি দোঁহে জগৎ-পরপার ৷ ৷
দু দিক হতে দুজনে যেন বহিয়া খরধারে
আসিতেছিল দোঁহার পানে ব্যাকুলগতি ব্যগ্রপ্রাণে,
সহসা এসে মিশিয়া গেল নিশীথপারাবারে ৷ ৷
থামিয়া গেল অধীর স্রোত, থামিল কলতান,
মৌন এক মিলনরাশি তিমিরে সব ফেলিল গ্রাসি—
প্রলয়তলে দোঁহার মাঝে দোঁহার অবসান ৷ ৷
১৪ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন