রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দূরে গিয়েছিলে চলি ৷ বসন্তের আনন্দভাণ্ডার
তখনো হয় নি নিঃস্ব; আমার বরণপুষ্পহার
তখনো অম্লান ছিল ললাটে তোমার ৷ হে অধীর,
কোন অলিখিত লিপি দক্ষিণের উদভ্রান্ত সমীর
এনেছিল চিত্তে তব ৷ তুমি গেলে বাঁশি লয়ে হাতে,
ফিরে দেখ নাই চেয়ে আমি বসে আপন বীণাতে
বাঁধিতেছিলাম সুর গুঞ্জরিয়া বসন্তপঞ্চমে;
আমার অঙ্গনতলে আলো আর ছায়ার সংগমে
কম্পমান আম্রতরু করেছিল চাঞ্চল্যবিস্তার
সৌরভবিহবল শুক্লরাতে ৷ সেই কুঞ্জগৃহদ্বার
এতকাল মুক্ত ছিল ৷ প্রতিদিন মোর দেহলিতে
আঁকিয়াছি আলিপনা ৷ প্রতিসন্ধ্যা বরণডালিতে
গন্ধতৈলে জ্বালায়েছি দীপ ৷ আজি কতকাল পরে
যাত্রা তব হল অবসান! হেথা ফিরিবার তরে
হেথা হতে গিয়েছিলে ৷ হে পথিক, ছিল এ লিখন—
আমারে আড়াল ক’রে আমারে করিবে অন্বেষণ;
সুদূরের পথ দিয়ে নিকটেরে লাভ করিবারে
আহবান লভিয়াছিলে সখা! আমার প্রাঙ্গণদ্বারে
যে পথ করিলে শুরু সে পথের এখানেই শেষ ৷ ৷
হে বন্ধু, কোরো না লজ্জা— মোর মনে নাই ক্ষোভলেশ,
নাই অভিমানতাপ ৷ করিব না ভর্ৎসনা তোমায়,
গভীর বিচ্ছেদ আজি ভরিয়াছি অসীম ক্ষমায় ৷
আমি আজি নবতর বধূ; আজি শুভদৃষ্টি তব
বিরহগুণ্ঠনতলে দেখে যেন মোরে অভিনব
অপূর্ব আনন্দরূপে, আজি যেন সকল সন্ধান
প্রভাতে নক্ষত্রসম শুভ্রতায় লভে অবসান ৷
আজি বাজিবে না বাঁশি, জ্বলিবে না প্রদীপের মালা,
পরিব না রক্তাম্বর; আজিকার উৎসব নিরালা
সর্ব-আভরণ-হীন ৷ আকাশেতে প্রতিপদ-চাঁদ
কৃষ্ণপক্ষ পার হয়ে পূর্ণতার প্রথম প্রসাদ
লভিয়াছে; দিকপ্রান্তে তারি ওই ক্ষীণনম্র কলা
নীরবে বলুক আজি আমাদের সব কথা-বলা ৷ ৷
২৭ পৌষ ১৩৩৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন