রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তখন রাত্রি আঁধার হল, সাঙ্গ হল কাজ—
আমরা মনে ভেবেছিলেম আসবে না কেউ আজ ৷
মোদের গ্রামে দুয়ার যত রুদ্ধ হল রাতের মতো—
দুয়েক জনে বলেছিল, ‘আসবে মহারাজ ৷’
আমরা হেসে বলেছিলেম, ‘আসবে না কেউ আজ ৷’
দ্বারে যেন আঘাত হল শুনেছিলেম সবে—
আমরা তখন বলেছিলেম, ‘বাতাস বুঝি হবে ৷’
নিবিয়ে প্রদীপ ঘরে ঘরে শুয়েছিলেম আলসভরে—
দুয়েক জনে বলেছিল, ‘দূত এল বা তবে ৷’
আমরা হেসে বলেছিলেম, ‘বাতাস বুঝি হবে ৷’
নিশীথরাতে শোনা গেল কিসের যেন ধ্বনি—
ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলেম মেঘের গরজনি ৷
ক্ষণে ক্ষণে চেতন করি কাঁপল ধরা থরহরি—
দুয়েক জনে বলেছিল, ‘চাকার ঝনঝনি ৷’
ঘুমের ঘোরে কহি মোরা, ‘মেঘের গরজনি ৷’
তখনো রাত আঁধার আছে, বেজে উঠল ভেরি—
কে ফুকারে, ‘জাগো সবাই, আর কোরো না দেরি ৷’
বক্ষ-’পরে দু হাত চেপে আমরা ভয়ে উঠি কেঁপে—
দুয়েক জনে কহে কানে, ‘রাজার ধ্বজা হেরি ৷’
আমরা জেগে উঠে বলি, ‘আর তবে নয় দেরি ৷’
কোথায় আলো, কোথায় মাল্য, কোথায় আয়োজন ৷
রাজা আমার দেশে এল, কোথায় সিংহাসন!
হায় রে ভাগ্য, হায় রে লজ্জা— কোথায় সভা কোথায় সজ্জা!
দুয়েক জনে কহে কানে, ‘বৃথা এ ক্রন্দন,
রিক্ত করে শূন্য ঘরে করো অভ্যর্থন ৷’
ওরে, দুয়ার খুলে দে রে, বাজা শঙ্খ বাজা—
গভীর রাতে এসেছে আজ আঁধার ঘরের রাজা ৷
বজ্র ডাকে শূন্যতলে, বিদ্যুতেরই ঝিলিক ঝলে,
ছিন্ন শয়ন টেনে এনে আঙিনা তোর সাজা—
ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখরাতের রাজা ৷ ৷
কলিকাতা
২৮ শ্রাবণ ১৩১২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন