রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি মোরে পার না বুঝিতে?
প্রশান্তবিষাদভরে দুটি আঁখি প্রশ্ন করে
অর্থ মোর চাহিছে খুঁজিতে,
চন্দ্রমা যেমন-ভাবে স্থিরনতমুখে
চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে ৷ ৷
কিছু আমি করি নি গোপন ৷
যাহা আছে সব আছে তোমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন ৷
দিয়েছি সমস্ত মোর করিতে ধারণা,
তাই মোরে বুঝিতে পার না? ৷
এ যদি হইত শুধু মণি,
শত খণ্ড করি তারে সযত্নে বিবিধাকারে
একটি একটি করি গণি
একখানি সূত্রে গাঁথি একখানি হার
পরাতেম গলায় তোমার ৷ ৷
এ যদি হইত শুধু ফুল,
সুগোল সুন্দর ছোটো, উষালোকে ফোটো-ফোটো,
বসন্তের পবনে দোদুল—
বৃন্ত হতে সযতনে আনিতাম তুলে,
পরায়ে দিতেম কালো চুলে ৷ ৷
এ যে, সখী, সমস্ত হৃদয় ৷
কোথা জল কোথা কূল, দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্যনিলয় ৷
এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রানী,
এ তবু তোমার রাজধানী ৷ ৷
কী তোমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয়-মাঝে নাহি জানি কী যে বাজে
নিশিদিন নীরব সংগীতে,
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যাপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতন ৷ ৷
এ যদি হইত শুধু সুখ,
কেবল একটি হাসি অধরের প্রান্তে আসি
আনন্দ করিত জাগরূক ৷
মুহূর্তে বুঝিয়া নিতে হৃদয়বারতা,
বলিতে হত না কোনো কথা ৷ ৷
এ যদি হইত শুধু দুখ,
দুটি বিন্দু অশ্রুজল দুই চক্ষে ছলছল,
বিষণ্ণ অধর, ম্লানমুখ—
প্রত্যক্ষ দেখিতে পেতে অন্তরের ব্যথা,
নীরবে প্রকাশ হত কথা ৷ ৷
এ যে, সখী, হৃদয়ের প্রেম—
সুখদুঃখবেদনার আদি অন্ত নাহি যার,
চিরদৈন্য, চিরপূর্ণ হেম ৷
নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবারাতে,
তাই আমি না পারি বুঝাতে ৷ ৷
নাই বা বুঝিলে তুমি মোরে ৷
চিরকাল চোখে চোখে নূতন-নূতনালোকে
পাঠ করো রাত্রিদিন ধরে ৷
বুঝা যায় আধো প্রেম, আধখানা মন—
সমস্ত কে বুঝেছে কখন ৷ ৷
পদ্মায়
রাজশাহীর পথে
১১ চৈত্র ১২৯৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন