রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার কুটিরের সমুখবাটে
পল্লীরমণীরা চলেছে হাটে ৷
উড়েছে রাঙা ধূলি, উঠেছে হাসি—
উদাসী বিবাগির চলার বাঁশি
আঁধারে আলোকেতে সকালে সাঁঝে
পথের বাতাসের বুকেতে বাজে ৷ ৷
যা-কিছু আসে যায় মাটির ’পরে
পরশ লাগে তারি তোমার ঘরে ৷
ঘাসের কাঁপা লাগে, পাতার দোলা,
শরতে কাশবনে তুফান তোলা,
প্রভাতে মধুপের গুনগুনানি,
নিশীথে ঝিঁঝিরবে জাল-বুনানি ৷ ৷
দেখেছি ভোরবেলা ফিরিছ একা,
পথের ধারে পাও কিসের দেখা!
সহজে সুখী তুমি জানে তা কেবা,
ফুলের গাছে তব স্নেহের সেবা—
এ কথা কারো মনে রবে কি কালি
মাটির ’পরে গেলে হৃদয় ঢালি? ৷
দিনের পর দিন যে দান আনে
তোমার মন তারে দেখিতে জানে ৷
নম্র তুমি, তাই সরলচিতে
সবার কাছে কিছু পেরেছ নিতে—
উচ্চ-পানে সদা মেলিয়া আঁখি
নিজেরে পলে পলে দাও নি ফাঁকি ৷
চাও নি জিনে নিতে হৃদয় কারো
নিজের মন তাই দিতে যে পারো ৷
তোমার ঘরে আসে পথিকজন,
চাহে না জ্ঞান তারা, চাহে না ধন—
এটুকু বুঝে যায় কেমন-ধারা
তোমারি আসনের শরিক তারা ৷ ৷
তোমার কুটিরের পুকুর-পাড়ে
ফুলের চারাগুলি যতনে বাড়ে ৷
তোমারো কথা নাই, তারাও বোবা—
কোমল কিশলয়ে সরল শোভা ৷
শ্রদ্ধা দাও, তবু মুখ না খোলে—
সহজে বোঝা যায় নীরব ব’লে ৷ ৷
তোমারি মতো তব কুটিরখানি,
স্নিগ্ধ ছায়া তার বলে না বাণী ৷
তাহার শিয়রেতে তালের গাছে
বিরল পাতাক’টি আলোয় নাচে—
সমুখে খোলা মাঠ করিছে ধূ-ধূ
দাঁড়ায়ে দূরে দূরে খেজুর শুধু ৷ ৷
তোমার বাসাখানি আঁটিয়া মুঠি
চাহে না আঁকড়িতে কালের ঝুঁটি ৷
দেখি যে পথিকের মতোই তাকে,
থাকা ও না-থাকার সীমায় থাকে ৷
ফুলের মতো ও যে, পাতার মতো—
যখন যাবে, রেখে যাবে না ক্ষত ৷ ৷
নাইকো রেষারেষি পথে ও ঘরে,
তাহারা মেশামেশি সহজে করে ৷
কীর্তিজালে-ঘেরা আমি তো ভাবি—
তোমার ঘরে ছিল আমারও দাবি,
হারায়ে ফেলেছি সে ঘূর্ণিবায়ে—
অনেক কাজে আর অনেক দায়ে ৷ ৷
[:শান্তিনিকেতন:]
চৈত্র ১৩৩৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন